৮ম অধ্যায়ঃ বৈদেশিক বিনিময় ও বৈদেশিক মুদ্রা

ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা / ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা (২য় পত্র)

৮ম অধ্যায়ঃ বৈদেশিক বিনিময় ও বৈদেশিক মুদ্রা

বর্তমানে ব্যবসায় বানিজ্য পৃথিবীব্যাপী। এক দেশের সাথে চলছে অন্য দেশের অবাধ বানিজ্য। কিন্তু সব দেশের মুদ্রার মূল্য একইরকম নয়। আর এ জন্যই সুষ্ঠু বিনিময় সম্পর্ক রক্ষার্থে নির্ধারণ করা হয় বিনিময় হার।

এটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই অধ্যায় থেকে প্রায় প্রতিবছর একটি করে সৃজনশীল প্রশ্ন পাওয়া যায়। তো, চলো আমরা দেখে আসি এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো  এবং তাদের আলোচনা। 

গুরুত্বপূর্ণ টপিকসঃ

  • বৈদেশিক বিনিময় ও বৈদেশিক বিনিময় হারের ধারণা। 
  • বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতি। 
  • ফ্যাক্টরিং ও ফোরফেটিং।
  • বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের পদ্ধতিসমূহ।
  • প্রত্যয়পত্রের প্রকারভেদ। 

CQ  স্পেশালঃ

  • প্রত্যয়পত্রের প্রকারভেদ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।


বৈদেশিক বিনিময় ও বৈদেশিক বিনিময় হারের ধারণাঃ

সাধারণত ‘বৈদেশিক বিনিময়’ শব্দটি দ্বারা বৈদেশিক মুদ্রাকে বোঝানো হয়। “ বৈদেশিক বিনিময় হলো এক ধরনের বিশেষ পদ্ধতি যার মাধ্যমে এক দেশের মুদ্রাকে অন্য দেশের মুদ্রায় রুপান্তর করা হয়”। এটি আন্তর্জাতিক দেনা-পাওনা নিষ্পত্তির উপায় বা পদ্ধতি।মানে, দুটি দেশের মুদ্রার মান যেহেতু সমান নয় তাই ঐ দুটি দেশের মধ্যে সুষ্ঠু ও সহজ লেনদেনের সুবিধার্থে এক দেশের মুদ্রার মানকে অন্য দেশের মুদ্রামানে রুপান্তর করা।

বিনিময় হার হলো একটি দেশের মুদ্রার বৈদেশিক মূল্যের পরিমাপক। “এক দেশের মুদ্রার সাথে আরেক দেশের মুদ্রার মূল্যানুপাতকে বিনিময় হার বলে”। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, কোন দেশের এক মুদ্রা অন্য দেশের যে পরিমান মুদ্রা বা স্বর্ণ আয় করতে সক্ষম তাকে বৈদেশিক বিনিময় হার বলে। যেমনঃ বাংলাদেশের ৮০টাকা দিয়ে আমেরিকান ১ডলার ক্রয় করা যায়,তাহলে টাকা ও ডলারের বিনিময় হার হবে ৭০:১ বা ৭০টাকা= ১ডলার। 

সুতরাং, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বলতে যেকোন দুটি দেশের মুদ্রার পারস্পরিক দরকে বুঝায়।


বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতিঃ

বিনিময় হার নির্ধারণ পদ্ধতি হলো এক দেশের মুদ্রার সাথে অন্য দেশের মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ প্রক্রিয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিময় হার নির্ধারণে প্রধানত ২টি নীতি অবলম্বন কিরা হয়ঃ

১. স্বর্ণমান (Gold Standard):

যে সকল দেশের মুদ্রায় স্বর্ণ থাকে বা নোটে ইস্যুর বিপক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বর্ণ জমা থাকে সে সকল দেশে স্বর্ণমানে বিনিময় হার নির্ধারণ করা যায়। এ সকল দেশে অবাধে স্বর্ণ আদান-প্রদান করা যেতে পারে। স্বর্ণের আন্তর্জাতিক দর অনুযায়ী এ সকল দেশের বিনিময় হার নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরুপ, বাংলাদেশের ১ টাকা মুদ্রায় ১ আউন্স সোনা আছে অপরদিকে আমেরিকার ১ ডলারে ৩৫ আউন্স সোনা আছে। তাহলে বাংলাদেশের টাকার সাথে আমেরিকার ১ ডলারের বিনিময় হার হবে ১:৩৫। 

২. কাগজি মুদ্রা (Paper Currency):

কাগজি মুদ্রামান ব্যবস্থায় ২টি তত্ত্বের সাহায্যে দুটি দেশের বৈদেশিক বিনিময় হার নির্ধারণ করা যায়। নিচে আলোচনা করা হলো,

ক) ক্রয় ক্ষমতার সমতা তত্ত্বঃ

এ তত্ত্বের উদ্ভাবক হচ্ছেন সুইডিশ অধ্যাপক “গুস্তাভ ক্যাসেল(Casael)”।এ মতবাদ অনুযায়ী দিটি দেশের বিনিময় হার নির্ধারিত হয় দু’দেশের মুদ্রার অভ্যন্তরীণ ক্রয় ক্ষমতার উপর। উদহারনস্বরুপ, বাংলাদেশে ৩ কেজি পেঁয়াজ কিনতে লাগে ৮০ টাকা। ঠিক একই মানের ৩ কেজি পেঁয়াজ কিনতে আমেরিকায় ১ ডলার খরচ হয়। তাহলে দুটি দেশের বিনিময় হার হবে ৮০:১। অর্থাৎ, দু’দেশের বিনিময় হার স্ব স্ব দেশের মুদ্রার ক্রয় ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল। 

এ নীতি বিভিন্ন কারণে কার্যকর নাও হতে পারে,

  • পন্যের বিভিন্ন বাজার ও বিভিন্ন প্রকার দাম।
  • মূলধনের আগমন ও বহির্গমণ 
  • বানিজ্যিক চুক্তির পরিবর্তন 
  • চাহিদা ও যোগানের নীতির পরিবর্তনশীলতা। 

খ) পরিশোধ ভারসাম্য নীতিঃ চাহিদা ও যোগান তত্ত্ব 

এক দেশে অন্য দেশের মুদ্রার চাহিদা ও যোগানের উপর ভিত্তি করে দিটি দেশের বিনিময় হার নির্ধারণ করা হয়।যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ও যোগান সমান হয় সেখানেই বিনিময় হার নির্ধারিত হবে। এই নীতিতেই বর্তমানে বৈদেশিক বিনিময় হার নির্ধারিত হয়।  এ তত্ত্ব অনুসারে যে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বেশি থাকে সে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কমে যায় এবং দেশীয় মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যায়। ফলে দেশের বিনিময় হার বেড়ে যায়।

অপরপক্ষে, অপর দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে যায় এবং দেশীয় মুদ্রার চাহিদা কমে যায়। মানে বিপরীত। যার ফলে বিনিময় হার ও কমে যাবে। 

এভাবে,  চাহিদা ও যোগানের হ্রাস-বৃদ্ধি যেখানে সমান হবে সেখানেই বৈদেশিক বিনিময় হার নির্ধারিত হবে। 


ফ্যাক্টরিং ও ফোরফেটিংঃ

ফ্যাক্টরিং (Factoring): 

 যে পদ্ধতিতে প্রাপ্য বিল ( বিনিময় বিল, অঙ্গীকারপত্র) কোন ব্যাংক বা আর্থিক কোম্পানির নিকট বন্ধক না রেখে সরাসরি বিলের মেয়াদ পূর্তির পূর্বে কম মূল্যে বিক্রি করে অর্থায়ন করা হয় তাকেই ফ্যাক্টরিং বলে। সাধারণত বানিজ্যিক ব্যাংক এই ফ্যাক্টরিং এর কাজ করে থাকে এবং এই ফ্যাক্টরিং এর কাজ যে করে তাকে ফ্যাক্টর(Factor) বলা হয়।

উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এমনকি ভারতেও Factoring এর মাধ্যমে  বস্ত্রশিল্প, চামিড়া শিল্প, ঔষধ শিল্পসহ বিভিন্ন প্রকার শিল্প ও বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই প্রাপ্যবিল ভাঙিয়ে স্বল্পমেয়াদী অর্থায়নের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে।

ফোরফেটিং (Forfeiting):

রপ্তানি বানিজ্যে অর্থ সংগ্রহের একটি কৌশল হলো ফোরফেটিং। ব্যাংক ফোরফেটিং এর মাধ্যমে রপ্তানিকারককে চালানের বিপরীতে অথবা আমদানিকারক ব্যাংকের নিশ্চিয়তার উপর ভিত্তি করে রপ্তানিকারককে অগ্রিম নগদ অর্থ প্রদান করে। সবসময় জামানত ছাড়াই ব্যাংক এ অর্থ প্রদান করে।

সহজভাবে, আমদানিকারকের নিকট পন্য পাঠিয়ে পন্যের মূল্যের জন্য রপ্তানিকারককে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। কাজেই এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে রপ্তানিকারক জরুরি প্রয়োজনে ফোরফেটিং মানে ব্যাংকের থেকে চালানের বিপরীতে অর্থায়নের সমস্যা মিটাতে পারে।


বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের পদ্ধতিসমূহঃ

এক দেশের মুদ্রা অন্য দেশে অচল। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে বৈদেশিক বানিজ্যের লেনদেনর নিষ্পত্তি ঘটে। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ের জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলো নিম্নরুপ,

১. স্বর্ণঃ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিনিময় মাধ্যম হলো স্বর্ণ বা Gold। বিভিন্ন কারণে এই পদ্ধতি এখন আর কোন দেশেই বিনিময় মাধ্যম হিসেবে প্রচলিত নেই। বিদেশে স্বর্ণ প্রেরণ যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি ব্যয়বহুল। 

২. ব্যাংক ড্রাফটঃ কোন একটি ব্যাংক যখন তার বিদেশের কোন শাখাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ প্রদানের জন্য আদেশপত্র দেয় তাকেই বৈদেশিক ব্যাংক ড্রাফট বলে।

৩. বৈদেশিক বিনিময় বিলঃ এটি বর্তমানে খুবই কার্যকরী এবং জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। একটা উদাহরণ দিয়ে দেখি,

মনে করি বাংলাদেশের অপু আমেরিকার এলেক্স এর নিকট থেকে ১০০০ ডলারের ঔষধ কিনল।অতঃপর একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঐ ১০০০ ডলার পরিশোধের জন্য এলেক্স তার স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে একটি বৈদেশিক বিনিময় বিল বাংলাদেশের অপুর নিকট পাঠাবে। প্রদেয় তারিখে এলেক্স আমেরিকায় অপুর ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা তুলে নিবে। আর এর আগেই অপু তার ব্যাংকে ১০০০ ডলার সহ ব্যাংকের কমিশন পরিশোধ করবে।

৪. আন্তর্জাতিক মানি অর্ডারঃ দুটি দেশ চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার এ টাকা লেনদেন করে থাকে।

৫. এটিএমঃ VISA, MASTER CARD ইত্যাদি এটিএম কার্ড ব্যবহার করে গ্রাহক এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারে। 

৬. ই-মেইলে প্রেরণঃ বর্তমানে ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি এটি।এক্ষেতে প্রেরক নির্দিষ্ট ফি সহ ব্যাংকে টাকা জমা দিলে ব্যাংক তাকে একটি গোপন কোড নাম্বার প্রদান করে। অতঃপর প্রাপক উক্ত ব্যাংকের বিদেশের শাখায় গিয়ে কোড নাম্বার ও অন্যান্য তথ্য প্রদানের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে নেয়।

৭. নগদ প্রত্যয়পত্রঃ এটিও একটি বহুলব্যবহৃত পদ্ধতি।  এই পদ্ধতিতে আমদানিকারক তার ব্যাংকের নিকট থেকে একটি প্রত্যয়পত্র নিয়ে তা রপ্তানিকারকের নিকট প্রেরণ করে। রপ্তানিকারক তা ব্যাংকে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।


প্রত্যয়পত্রের প্রকারভেদঃ

যে পত্রের মাধ্যমে ব্যাংক আমদানিকারকের পক্ষে এবং রপ্তানিকারকের অনুকূলে আমদানিকৃত পন্যের মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা প্রদান করে তাকে প্রত্যয়পত্র বা Letter of Credit বলে।

শুধু গুরুত্বপূর্ণ প্রকারভেদ গুলো বর্ণনা করছি,

১. ব্যাক টু ব্যাক প্রত্যয়পত্রঃ রপ্তানিকারক তার পন্য রপ্তানি করে আমদানিকারকের নিকট থেকে একটা প্রত্যয়পত্র পায়। সেই প্রত্যয়পত্রের টাকা পাওয়ার আগেই রপ্তানিকারক আবার কিছু/কাচামাল আমদানি করতে  ঐ প্রত্যয়পত্রের বিপক্ষে আরেকটা প্রত্যয়পত্র ইস্যু করতে পারে তার রপ্তানিকারকের নিকট।এক কথায়, ব্যাক টু ব্যাক প্রত্যয়পত্র হলো মূল প্রত্যয়পত্রের বিপক্ষে রপ্তানিকারককে কাচামাল ক্রয়ের জন্য আরেকটি প্রত্যয়পত্র ইস্যু করা।

২. ঘূর্ণায়মান প্রত্যয়পত্রঃ কোন ব্যাংক যখন একটি নির্দিষ্ট পরিমান টাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যবহার উপযোগী প্রত্যয়পত্র ইস্যু করে এবং  একই পরিমান টাকার লেনদেনের জন্য উক্ত মেয়াদের ভিতর বারবার ব্যবহার করা যায়, তাই ঘূর্ণায়মান প্রত্যয়পত্র। 

৩. ভ্রাম্যমান প্রত্যয়পত্রঃ যে প্রত্যয়পত্রের মাধ্যমে ইস্যুকারী ব্যাংকের বিদেশস্থ একাধিক শাখা বা প্রতিনিধির নিকট থেকে অর্থ উঠানো যায় তাকে ভ্রাম্যমাণ প্রত্যয়পত্র বলে।

এখানে ব্যাক টু ব্যাক প্রত্যয়পত্র সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলেই হবে।

এই ছিল এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো এবং তাদের আলোচনা। এই টপিক গুলো ভালো করে বুঝে নিলেই হবে। আর এমসিকিউ এর জন্য বই থেকে অধ্যায়টা একবার রিভিশন দিলেই হবে।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party