১২ তম অধ্যায়ঃ নৌবিমা

ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা / ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা (২য় পত্র)

১২ তম অধ্যায়ঃ নৌবিমা

অতি প্রাচীনকাল থেকেই যোগাযোগ ও ব্যবসায় বানিজ্যের ক্ষেত্রে নৌপথ বা সমুদ্রপথ ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণেই নৌ পথে ঝুঁকির পরিমান বেশি। আর এ সকল ঝুঁকি মোকাবেলা করতেই নৌবিমার উৎপত্তি। 

এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করবো নৌবিমা নিয়ে।এই অধ্যায়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এডমিশন এইচএসসি উভয় পরীক্ষা তেই এটা থেকে প্রশ্ন আসে। তাই চলো এই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো এবং তাদের বিস্তারিত আলোচনা দেখে আসি,

 গুরুত্বপূর্ণ টপিকসঃ

  • নৌবিমার ধারণা।
  • নৌবিমা পত্রের প্রকারভেদ। 
  • নৌবিমার অপরিহার্য শর্তাবলী। 
  • বিভিন্ন প্রকার নৌবিপদ  সমূহ।
  • বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক ক্ষতি। 
  • Jettison, লয়েড বিমা ও নৌবিমা চুক্তি ক্ষতিপূরণের চুক্তি।

CQ স্পেশালঃ

  • নৌবিমা পত্রের প্রকারভেদ এবং বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক ক্ষতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।


নৌবিমার ধারণাঃ

নৌপথে প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক ক্ষয়-ক্ষতি পূরণের উপর ভিত্তি করে নৌবিমা চুক্তির উদ্ভব হয়। সহজ কথায় , “নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিমিয়ামের পরিবর্তে সমুদ্র যাত্রার জাহাজ বা জাহাজে পরিবাহিত পন্য সামগ্রী বিনষ্ট হলে তার ক্ষতিপূরণের অঙ্গীকার প্রদান করে বিমাকারী ও বিমা গ্রহীতার মাঝে যে চুক্তি হয়,তাকেই নৌবিমা চুক্তি বলে”। বিমা কোম্পানি হলো বিমাকারী আর যে বিমা করায় সে হলো বিমা গ্রহীতা। এটি একটি ক্ষতিপূরণের চুক্তি। 


নৌবিমা পত্রের প্রকারভেদঃ

নৌ বিমাপত্র বেশ কয়েক ধরনের শুধু গুরুত্বপূর্ণ গুলো তুলে ধরছি,

১. যাত্রা বিমাপত্রঃ যে বিমাপত্রে নির্দিষ্ট যাত্রাপথের উল্লেখ থাকে তাকে যাত্রা বিমাপত্র বলে।এই বিমাপত্রে সমুদ্র যাত্রা শুরু ও গন্তব্য বন্দরের নাম উল্লেখ থাকে। জাহাজ যদি যাত্রাপথ পরিবর্তন করে এবং অন্য বন্দরে যাওয়ার পথে ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাহলে বিমা কোম্পানি দায়ী থাকবে না।

২. সময় বিমাপত্রঃ যে বিমাপত্র সময়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় তাকে সময় বিমাপত্র বলে। নৌ বিমাপত্র সাধারণত ১বছর বা তার কম সময়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। যেমনঃ ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি ভোর ৬ টা হতে– ২০২১ সালের ১লা জানুয়ারি ভোর ৬ টা পর্যন্ত  ১ বছর মেয়াদ। এই সময়ের মধ্যে যদি বিমা গ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে বিমাকারী তা বহন করবে। সাধারণত জাহাজের জন্য এই বিমা করা হয়।

৩. মিশ্র বিমাপত্রঃ যাত্রা ও সময় বিমাপত্রের বিষয়বস্তু মানে নির্দিষ্ট যাত্রাপথের উল্লেখ থাকবে সাথে সুনির্দিষ্ট সময় থাকবে, এই ভিত্তিতে বিমা চুক্তি করা হলে তাকে মিশ্র বিমাপত্র বলে।

৪. মূল্যায়িত অমূল্যায়িত বিমাপত্রঃ যে বিমাপত্রে বিমাচুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই ক্ষতিপূরনের পরিমান বা মূল্য নির্ধারণ করা হয় তাকে মূল্যায়িত বিমাপত্র আর ক্ষতি হওয়ার পর মূল্য নির্ধারণ করা হলে তাকে অমূল্যায়িত বিমাপত্র বলে। 

৫. ভাসমান বিমাপত্রঃ বিভিন্ন গতিপথে পণ্যদ্রব্যাদি নিয়ে চলাচলকারী, একাধিক জাহাজের জন্য একটিমাত্র বড় অঙ্কের বিমাচুক্তি করা হলে তাকে ভাসমান বিমাপত্র বলে। এর ফলে ভিন্ন ভিন্ন জাহাজের জন্য বিমা করতে হয় না।

৬. যৌগিক বিমাপত্রঃ বড় অঙ্কের বিমা করানোর জন্য যখন একাধিক বিমা কোম্পানি মিলে বিমাচুক্তি সম্পাদন করে তাকে যৌগিক বিমাপত্র বলে। যেমনঃ অপু ১ কোটি টাকার বিমা করবে তার জন্য A কোম্পানি ৫০ লক্ষ, B কোম্পানি ৩০ লক্ষ ও চ কোম্পানি ২০ লক্ষ টাকার বিমা দায় গ্রহন করে বিমাচুক্তি করলো।

৭. যুগ্ম বিমাপত্রঃ একই জাহাজের জন্য দুইবার বিমা করা হলে তাকে যুগ্ম বিমাপত্র বলে।তবে এক্ষেত্রে ক্ষতি হলো দুই কোম্পানি আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ দেয়। আলাদাভাবে পুরো ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায় না।

৮. ছাউনি বিমাপত্রঃ যে বিমাপত্র নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য করা হয় তাজে ছাউনি বিমাপত্র বলে। এই বিমাপত্রে প্রিমিয়ামের সম্পুর্ন টাকা একত্রে পরিশোধ করা হয়।

এগুলো ভালো করে বুঝে নিলেই হবে।


নৌবিমার অপরিহার্য শর্তাবলীঃ

নৌবিমা চুক্তির ক্ষেত্রে চুক্তির দুপক্ষ বিমাকারী ও বিমা গ্রহীতাকে চুক্তির স্বার্থে যে সকল বিষয়গুলো অবশ্যই পালন করতে হয় তাকেই চুক্তির শর্ত বলে।

ক) ব্যক্ত শর্তঃ

  • যাত্রার তারিখ, অর্থাৎ কোন তারিখে জাহাজ ছাড়বে ও বন্দরে পৌছাবে তা উল্লেখ থাকতে হবে।
  • যাত্রার সময়, সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখ থাকবে।
  • জাহাজে পর্যাপ্ত ররক্ষীবাহিনী থাকতে হবে।
  • যুদ্ধ চলাকালীন নিরপেক্ষ দেশের জাহাজ হতে হবে।
  • জাহাজ কোন কোন পথে যাবে তার নির্দিষ্ট সমুদ্রসীমা উল্লেখ থাকতে হবে।
  • জাহাজটির সমুদ্রযাত্রা আইন সম্মত হতে হবে।

খ) অব্যক্ত শর্তঃ

  • জাহাজটি চলাচলের যোগ্য হতে হবে।
  • জাহাজটির যাত্রা বৈধ হতে হবে।
  • বিলম্ব করা যাবে না।
  • জাহাজটি যেন নির্দিষ্ট গতিপথ পরিবর্তন না করে।
  • গন্তব বন্দর ব্যাতিত অন্য বন্দরে যেতে পারবে না।


বিভিন্ন প্রকার নৌবিপদ  সমূহঃ

নৌপথে নানা রকম বিপদ আসে। নিচে দেখো,

ক) প্রাকৃতিক বিপদঃ

  • সামুদ্রিক ঝড় তুফান।
  • সাইক্লোন। 
  • ডুবন্ত পাহাড়।
  • সামুদ্রিক ঢেউ।
  • ভাসমান বরফ খন্ড।

খ) অপ্রাকৃতিক বিপদঃ

  • জলদস্যু 
  • চোর-ডাকাত 
  • যুদ্ধ
  • কাপ্তান-কর্মচারীদের ষড়যন্ত্র।
  • অগ্নিসংযোগ 
  • বিস্ফোরণ 
  • শত্রুতা


বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক ক্ষতিঃ

সামুদ্রিক ক্ষতিকে বিভিন্ন প্রকারে ভাগ করা যায়,

১. সামগ্রিক ক্ষতিঃ

ক) প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতিঃ বিমাকৃত জাহাজ বা পন্য সম্পুর্ন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাই প্রকৃত সামগ্রিক ক্ষতি। এক্ষেত্রে সম্পদ উদ্ধার করা যায় না এমনকি সম্পদ সনাক্ত করাও যায় না।

খ) উদ্ধারযোগ্য সামগ্রিক ক্ষতিঃ বিমাকৃত সম্পদ এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা উদ্ধার করা যাবে। তবে উদ্ধার খরচ সম্পদের মূল্য অপেক্ষা বেশি হয়ে থাকে। যেমনঃ জাহাজের মূল্য ৫ কোটি হলে উদ্ধার খরচ ৬ কোটি।

২. আংশিক ক্ষতিঃ

ক) সাধারণ আংশিক ক্ষতিঃ সকল পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করে বিপদের সময় সেচ্ছায় যে ত্যাগ স্বীকার করা হয় তাই সাধারণ আংশিক ক্ষতি। যেমনঃ জাহাজ ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে কিছু পন্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করা।

খ) বিশেষ আংশিক ক্ষতিঃসামুদ্রিক বিপদের কারণে আকস্মিকভাবে বিমাকৃত সম্পদের কোন এক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাই বিশেষ আংশিক ক্ষতি। 

৩. ব্যয় সংক্রান্ত ক্ষতিঃ

ক) ক্ষতি হ্রাস সংক্রান্ত খরচঃ বিমাকারী কোন ক্ষতি মেনে নিলে।

খ) উদ্ধার খরচঃ জাহাজ ডুবে গেলে তৃতীয় কোন দেশ বা পক্ষের সাহায্যে জাহাজ উদ্ধারের খরচ।

গ) বিশেষ খরচঃ জাহাজে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রকাশিত খরচ।

ঘ) অতিরিক্ত খরচঃ কোন বিমাদাবি প্রমান করতে গিয়ে যে খরচ হয়। যেমনঃ মামলা খরচ।


Jettison, লয়েড বিমা ও নৌবিমা চুক্তি ক্ষতিপূরণের চুক্তিঃ

পন্য নিক্ষেপণ/Jettison: ঝড়-ঝঞ্ঝা বা অন্যবকোন কারণে বিপদগ্রস্ত জাহাজ হালকা করার জন্য যদি জাহাজের কিছু পন্য সমুদ্রে ফেলে দিতে হয়, তখন তাকে পন্য নিক্ষেপণ বা Jettison  বলে।

লয়েড বিমাঃ লয়েড হচ্ছে বহু সংখ্যক  অবলেখক বা দায় গ্রাহকদের একটি সংঘ বা সমিতি। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে Edward Lloyd নামক লন্ডনের এক কফি ব্যবসায়ীর কারখানাকে কেন্দ্র করে এটি গড়ে উঠে। সেই কফিখানায় আগে নাবিকরা আড্ডা দিত। লয়েড সেখান থেকে জাহাজ ও সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ করে জাহাজের গতিবিধি ও মুদ্রার বিনিময় হার উল্লেখ করে একটি লিস্ট প্রকাশ করে নিজের নাম( Lloyd’s List). ১৮৭১ সালে এটি The Corporation of Lloyd’s নামে পুনর্গঠিত হয়।  বর্তমানে তা ২৭৯ জন দায় গ্রাহক ও ২৬০ জন দালানের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়(পরিবর্তনশীল)।

মূলত এটি একটি বিমা কোম্পানি। 


নৌবিমা চুক্তি ক্ষতিপূরণের চুক্তিঃ

জীবন বিমা ব্যতীত সকল বিমা চুক্তিই ক্ষতিপূরণের চুক্তি। এটি বিমার একটি মৌলিক নীতি। ক্ষতি হলে তার মূল্য পরিশোধ করে পুষিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু জীবিন বিমায় কেউ মারা গেলে আর ফিরিয়ে এনে দেয়া যায় না তাই এটিকে নিশ্চয়তার চুক্তি বলা হয়।সুতরাং, জীবন বীমা ব্যতীত সব বিমা চুক্তি হলো ক্ষতিপূরণের চুক্তি।এই চুক্তি অনুযায়ী বিমাকারী নির্দিষ্ট প্রমিয়ামের বিনিময়ে বিমাগ্রহীতার সম্পত্তির যে ক্ষয়ক্ষতি হবে তা পূরণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এজন্যই নৌবিমা চুক্তি ক্ষতিপূরণের চুক্তি। 


এই ছিল এ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিক এবং তাদের বিস্তারিত আলোচনা। ভালো করে এখান থেকে পড়ে নিলে আর বাড়তি কিছু পড়ার দরকার হবে না। তবুও এমসিকিউ এর জন্য বই থেকে এই টপিক গুলোই আরেকটু ভালো করে পড়ে নিও।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party