১০ তম অধ্যায়ঃ বিমা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা

ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা / ফাইনান্স, ব্যাংকিং ও বীমা (২য় পত্র)

১০ তম অধ্যায়ঃ বিমা সম্পর্কে মৌলিক ধারণা

সাধারণত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্যেই বিমার প্রয়োজন হয়। বিমা মানুষের জীবনের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। এই অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করবো এই বিমা নিয়ে। এই অধ্যায়ে বিমার মৌলিক যে বিষয়গুলো আছে সেগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে। প্রতিবছর এ অধ্যায় থেকে একটি সৃজনশীল প্রশ্নও করা হয়। চলো তাহলে শুরু করা যাক,

গুরুত্বপূর্ণ টপিকসঃ

  • বিমার ধারণা ও গুরুত্ব।
  • বিমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
  • ঝুঁকির ধারণা ও প্রকারভেদ। 
  • বিমা ব্যবসায়ের মূলনীতি★।
  • বিমার শ্রেণীবিভাগ। 

CQ স্পেশালঃ

  • বিমা ব্যবসায়ের মূলনীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। এখান থেকে একটা সৃজনশীল আসেই। নিচে দেয়া ৬টা নীতিই ভালো করে পড়ে নিবে।


বিমার ধারণা ও গুরুত্বঃ

মানুষের জীবন ও জীবিকা সবসময় অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে পরিচালিত হয়। আর এই ঝুঁকিজনিত প্রতিবন্ধকতা দূর করে বিমা। ঝুঁকি থেকেই বিমার উৎপত্তি। সহজ অর্থে, “বিমা হলো নির্দিষ্ট প্রিমিয়ামের বিনিময়ে বিমাকারী ও বিমা গ্রহীতার মাঝে সম্পাদিত একটি ক্ষতিপূরণ ও নিশ্চয়তার চুক্তি”। মানুষের জীবনের জন্য যখন বিমা করা হয় তখন তা নিশ্চয়তার চুক্তি কারণ মানুষ মারা গেলে তার ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব নয় তাই আর্থিক সাহায্যের নিশ্চয়তা দেয়া হয়। আর জীবন ব্যতীত অন্য কোন সম্পদের জন্য বিমা করা হলে তা হয় ক্ষতিপূরণের চুক্তি, কারণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিয়ে পুষিয়ে দেয়া হয়।

বিমার গুরুত্বঃ

১. ব্যক্তিগত জীবনে বিমার গুরুত্বঃ

  • আর্থিক নিরাপত্তা বিধান।
  • সঞ্চয় সৃষ্টি করে।
  • বিনিয়োগের সুযোগ লাভ।
  • বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন। 

২. ব্যবসায় সম্প্রসারণে বিমার গুরুত্বঃ

  • ঝুঁকিগত প্রতিবন্ধকতা হ্রাস।
  • বিনিয়োগ উৎসাহ সৃষ্টি। 
  • বৈদেশিক ব্যবসায়ের উন্নয়ন। 

৩. সামাজিক গুরুত্বঃ

  • জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। 
  • কর্মসংস্থান। 
  • বেকার সমস্যা সমাধান।

৪. অর্থনৈতিক গুরুত্বঃ

  • মূলধন গঠন ও নিরাপদ বিনিয়োগ। 
  • আর্থিক ক্ষতিপূরণ। 
  • সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি। 


বিমার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ

বিমা সম্পর্কে এখন মোটামুটি সবাই ক্লিয়ার। এই বিমা অতিপ্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর নানাদেশে এর প্রচলন ও ব্যবহার লক্ষ করা যেত। যদিও বিমা সম্পর্কে নানা বিতর্ক রয়েছে তবুও জোর দিয়ে বলা যায় যে, বিমার আদি জন্মস্থান ইতালি। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে ইতালিয়ান বণিকরা তাদের পন্য ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে চালান দেয়ার সমিয় বিমার সাহায্য নিতেন। কারণ তাদের পন্য সমুদ্রপথে নানা বিপদের সম্মুখীন হতো। প্রকৃতির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই নানা ঝড়ে সব পন্য এমনকি জাহাজ সমুদ্রের গর্ভে নিমজ্জিত হতো। আবার জলদস্যুরা লুটপাট করে নিয়ে যায়। মূলত এসব ঝুঁকি মোকাবিলার জন্যই বিমার উৎপত্তি ঘটে আর তা হলো নৌবিমা(প্রথম বিমা)। 

ব্যবসায়-বানিজ্যের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের লয়েড কতৃক সর্বপ্রথম নৌবিমার প্রচলন ঘটে। পরবর্তীকালে ১৬৬৬ সালে লন্ডন এবং ১৮৬১ সালে টালি এস্টেটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ফলে আগুনের ক্ষতি হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য ১৮৬৫ সালে সর্বপ্রথম ব্রিটেনে অগ্নিবিমার প্রচলন হয়। এরপর ১৮৯৬ সালে Hand in Hand নামক জীবন বিমা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে প্রথম জীবন বিমার প্রচলন হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯২৮ সালে প্রথম বিমা আইন প্রনয়ণ করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চে।

বর্তমানে ২০০১ সালের আইন অনুযায়ী ২০টি( ১৯টি বেসরকারি বিমা কোম্পানি) জীবন বিমা কোম্পানি, বেসরকারি পর্যায়ে ৪৫ টি সাধারণ বিমা কোম্পানি পরিচালিত আছে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিমা আইন ২০১০ নামে চালু আছে। 


ঝুঁকির ধারণা ও প্রকারভেদঃ

ঝুঁকি শব্দটির সাথে সবাই পরিচিত। ঝুঁকির সহজ সঙ্গা হলো “কোন একটি আর্থিক ক্ষতি সংঘটনের অনিশ্চয়তাকে ঝুঁকি বলে। ভবিষ্যতের যে অবস্থা সম্পর্কে বর্তমানে কোন জ্ঞান নাই বা কিছু জ্ঞান থাকলেও তা অর্থহীন তাকে অনিশ্চয়তা বা Uncertainty বলে। আর ঝুঁকি হলো অনিশ্চয়তার পরিমাপযোগ্য অংশ। যেখানে কোন আর্থিক ক্ষতির ব্যাপারে অনিশ্চয়তা থাকে সেখানে ঝুঁকি থাকে। 

ঝুঁকির প্রকারভেদঃ

১. আর্থিক ঝুঁকিঃ কোন বিনিয়োগ থেকে ঋণের সুদ বা সুদসহ ঋণের অর্থ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত নগদ প্রবাহ সৃষ্টি না হওয়ার সম্ভাবনাকে আর্থিক ঝুঁকি বলে। অর্থাৎ ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারার সম্ভাবনা। 

২. ব্যবসায় ঝুঁকিঃ ব্যবসায়িক কাজে ভবিষ্যতে লাভ-লোকসানের যে অনিশ্চয়তা থাকে তার পরিমাপযোগ্য অংশই ব্যবসায় ঝুঁকি। 

৩. বিশুদ্ধ ঝুঁকিঃ যে ঝুঁকির ক্ষেত্রে শুধু ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে তা হলো বিশুদ্ধ ঝুঁকি। 

৪. ফটকা ঝুঁকিঃ যে ঝুঁকিতে লাভ বা ক্ষতি উভয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই ফটকা ঝুঁকি। 

৫. প্রাকৃতিক ঝুঁকিঃ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিই হলো প্রাকৃতিক ঝুঁকি। 

৬. বিমাযোগ্য ঝুঁকিঃ যে ঝুঁকি অনিয়ন্ত্রণযোগ্য, পরিমাপযোগ্য, অনুমানযোগ্য ও আকষ্মিকভাবে ঘটে সে ঝুঁকি জন্য বিমা করা যায় বলে তাকে বিমাযোগ্য ঝুঁকি বলে। 


বিমা ব্যবসায়ের মূলনীতিঃ

বিমা ব্যবসায়কে সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করার জন্য কতগুলো রীতিনীতি প্রয়োজন হয়, যা নীতি নামে পরিচিত।  বেশ কয়েকটি নীতি রয়েছে, আমরা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নীতি গুলো দেখবো,

১. বিমাযোগ্য স্বার্থের নীতিঃ “বিমাকৃত বিষয়বস্তুর উপর বিমা গ্রহীতার বৈধ অধিকার বা আর্থিক স্বার্থকেই বিমাযোগ্য স্বার্থ বলে”। বিমাযোগ্য স্বার্থ না থাকলে বিমাচুক্তি হয় না। আর যদি হয়ও তবে তাকে বাজি চুক্তি বা জুয়া খেলার চুক্তি বলে। যে বিমা করাবে তার অধিকার থাকতে হবে। যেমনঃ তোমার একটি সাইকেল আছে। তুমি এটার বিমা করাতে পারবে কিন্তু তোমার বন্ধু চালাতে নিয়ে যদি বিমা করাতে চায় তাহলে সে পারবে না।

২. পরম স্বদ্বিশ্বাসের নীতিঃ এটি একটি অন্যতম নীতি। বিমাকারী ও বিমা গ্রহীতা দুজন দুজনকে সঠিক তথ্য প্রদান করবে। এতে দুজনের মাঝে স্বদ্বিশ্বাসের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ব্যতিক্রম হলে বিমা চুক্তি বাতিল বলে গন্য হবে।

. আর্থিক ক্ষতিপূরণের নীতিঃ এ নীতির মূলকথা হলো বিমা গ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমাকারী তাকে আর্থিকভাবে বা অর্থ দ্বারা ক্ষতিপূরণ দিবে বা পুষিয়ে দিবে। এই নীতি জীবন বিমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ জীবনের ক্ষেত্রে ক্ষতি নিরুপন করা যায় না। জীবন বিমা ব্যতীত অন্যান্য বিমার ক্ষেত্রে এ নীতি প্রযোজ্য। 

. ক্ষতির নিকটতম কারণ নীতিঃ এ নীতি অনুযায়ী, বিমাপত্রে উল্লেখিত কারণের শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমাকারী ক্ষতিপূরণ দিবে। যদি বিমাপত্রে নেই এমন কোন কারণে ক্ষতি হয় তাহলে বিমাকারী ক্ষতিপূরণ দিবে না।

. আনুপাতিক হারে অংশগ্রহণ নীতিঃ এ নীতির মূলকথা হলো, বিমার বিষয়বস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিমাকারী কোম্পানি গুলো আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ দিবে।যেমনঃ আপু দুটি বিমা কোম্পানির নিকট একই বিষয়বস্তুর জন্য ৫,০০,০০০ লক্ষ টাকার যুগ্ম বিমা করলো। এখন তার ক্ষতি হয়েছে ২,০০,০০০ টাকা। তাহলে দুই কোম্পানি ১,০০,০০০ টাকা করে দিবে। আর যদি এক কোম্পানি ২ লক্ষ টাকা দিয়ে দেয় তাহলে সে অন্য কোম্পানির নিকট থেকে ১ লক্ষ টাকা নিয়ে নিবে। 

. স্থলাভিষিক্তের নীতিঃ এ নীতি অনুযায়ী, বিমাকারী বিমা গ্রহীতার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয়ার পর যদি ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের কিছু উদ্ধার করা যায় তাহলে তা বিমা কোম্পানি নিবে। বিমা গ্রহীতা তা আর দাবি করতে পারবে না,কারণ বিমা কোম্পানি তো তার ক্ষতিপূরণ দিয়েই দিয়েছেন। সুতরাং  ক্ষতিগ্রস্ত সম্পত্তি হতে কিছু উদ্ধার করা সম্ভব হলে তার মালিক বিমাকারী হবে। আর স্থলাভিষিক্তের নীতি বলার কারণ হলো, উদ্ধারযোগ্য সম্পত্তির মালিকানায় বিমা গ্রহীতার স্থানে বিমাকারী চলে আসে তাই।

এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ নীতি।এর বেশি না পড়লেও হয়। তবুও তোমার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বাকি নীতিগুলি বই থেকে একবার দেখে নিলেই হবে।


বিমার শ্রেণীবিভাগঃ

বিমার ইতিহাসে নৌবিমা সর্বপ্রথম পদচিহ্ন একে গেলেও কালের বিবর্তনে অগ্নি বিমা, জীবন বিমাসহ নানা বিমার উৎপত্তি ঘটে। চলো তাহলে আমরা দেখে আসি,

১. জীবন বিমাঃ মানুষের জীবনের নানা ক্ষয়ক্ষতির উপর গৃহীত বিমাই হলো জীবন বিমা। জীবনে না বলেই অনেক দুঃখ দুর্দশা নেমে আসে।আর তা থেকেই নিরাপত্তার জন্য এ বিমা করা হয়।

  • আজীবন বিমা।
  • মেয়াদি বিমা।
  • সাময়িক বিমা।
  • যৌথ বিমা।
  • স্বাস্থ্য বিমা।
  • শিক্ষা বিমা ও পারিবারিক বিমা
  • ব্যক্তিগত দুর্ঘটনা বিমা। 

জীবন বিমার অধ্যায়ে আরো বিস্তারিত জানবে।

২. সাধারণ বিমাঃ মানুষের জীবিন ব্যতীত অন্য কোন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষতিপূরণের জন্য যে বিমা করা হয় তাই সাধারণ বিমা। 

  • নৌবিমা–নৌপথে বিপদ মোকাবেলায়। 
  • অগ্নি বিমা– অগ্নিসংযোগ জনিত কারনে ক্ষতি মোকাবেলায়। 
  • শস্য বিমা–শস্যের ক্ষতি হলে সে ক্ষতি কাটিটে উঠতে এ বিমা করা হয়।
  • গবাদিপশু বিমা।
  • দুর্ঘটনা বিমা।
  • চৌর্য বিমা ও দায় বিমা।

৩. অন্যান্য বিমাঃ

  • পুনর্বিমা।( এক বিমা কোম্পানি অন্য আরেক বিমা কোম্পানির সাথে বড় অঙ্কের কোন বিমা দায় বন্টন করতে এ বিমা করে। এখানে উভউ পক্ষই বিমা প্রতিষ্ঠান।) 
  • দ্বৈত বিমা।
  • বেকারত্ব বিমা।
  • মাতৃমঙ্গল বিমা।
  • শ্রমিক-কর্মচারী বিমা।


পরবর্তী অধ্যায় গুলোতে এ বিমা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবে। এগুলো শুধু বুঝে নিবে যে কোনটা কি বিমা। মানে কাকে বলে টা জানলেই হবে।
এই ছিল এ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ টপিকস এবং তাদের বিস্তারিত আলোচনা। আশাকরি বুঝতে পেরেছো। কোন কিছু বুঝতে সমস্যা হলে আবার পড়ে দেখো। এমসিকিউর জন্য বই থেকে এই অধ্যায়ের বিগত সালের গুলো সাথে একবার রিডিং পড়ে নিতে পারো। সবার জন্য শুভকামনা রইলো।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party