সং

para-01-scaled
Pen's Creation

সং

একদিকে সং লোক হাসাতে ব্যাস্ত অন্যদিকে তার পরিবার ক্ষুধার যন্ত্রণায় মত্ত। প্রত্যেক পেশাজীবনেই এমন সংঘর্ষ থাকে, নানা গল্প থাকে, তাই পরিশ্রমিদের করুণার সিংহাসনে না বসিয়ে, শ্রদ্ধা জানানো সমীচীন।

দেওয়ানপুরের ছোট্ট গ্রাম থেকে শহরে এসেছে চাঁন মিয়া। দলের সাথে সার্কাসের খেলা দেখাতে এসেছে, সে একজন সং। উনিশ শতকের দিকে উদ্ভূত সার্কাস, এই একবিংশ শতাব্দীতেও চাঁন মিয়ার জীবিকার অবলম্বন। অন্য কোন পেশায় সুবিধা করতে না পারায়, বিশেষ কোন দক্ষতা না থাকায় বাধ্য হয়েই সার্কাসের সং সেজে জীবিকা চালান। মাঝে মাঝেই চাঁন মিয়ার মনে হয়, এই লোক হাসানো তামাশা আর ভালো লাগে না। গ্রামে রেখে আসা দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা পরিবারের মুখ ভেসে ওঠে তার কোন এক দুঃস্বপ্নে। তার দুরবস্থার বর্ণনা কবি সাহিত্যের রচনায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বলা যায় যে, তার জীবনে যেনো ঘড়ির কাটা, ঘুরে-ফিরে একই জায়গায় আসতে বাধ্য! সে দারিদ্র্যেরই সন্তান।

শত দারিদ্র্যের মাঝেও চাঁন মিয়া অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল, একটু আধটু ইংরেজিও বলতে পারত। অভাব হঠাৎ এমনই বিষধর সাপ স্বরুপ ফণা তুললো যে পড়াশোনার অস্তিত্বই চুকে গেলো। চাঁন মিয়ার মন খারাপ থাকলেই সে ‘স্ববিরোধী’ কবিতার দু-চার লাইন আবৃত্তি করে নিজেকে সান্ত্বনা দিত-

“জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম
এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায়।”

প্রতিদিনের মতো আজও মুখে রং মেখে বিতৃষ্ণার জীবন নিয়ে মঞ্চে উঠলো চাঁন মিয়া। বিশাল মঞ্চ গেটে রঙিন লোগো ঝুলানো, দর্শক এখনো যাতায়াত করছে। ভাগ্যের চাকার প্রকৃতি কেমন, তার কোন বর্ণনা আমি খুঁজে পাই নি তবে তার উপরে বিশ্বাস শতভাগ লোকের ষোলো আনা দেখেছি। চাঁন মিয়ার কাজ মূলত কিছু শারীরিক কসরত এবং জাগলিং। আজও সে তাই করছিলো। আগুনের গোলা দিয়ে জাগলিং দেখাচ্ছিলো। চাঁন মিয়ার সহযোগী এক সং ইউনিসাইক্লিং করতে গিয়ে তাল হারিয়ে তার সঙ্গে ধাক্কা খেলো। চাঁন মিয়ার হাতের আগুনের গোলাটি ছিটকে পড়ল দর্শকের ছাউনের উপর। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো ছাউনি, চারদিকে হৈ চৈ।  ছাউনির নিচে কিছু বিদেশী দর্শকও ছিলো। এরই মাঝে এক বিদেশী নাকি গুরুতর আহত হয়েছে,অনেকটা পুড়ে গেছে। ভয়ে উত্তেজনায় চাঁন মিয়া মঞ্চ থেকে নেমে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। সে কেন ছুটছে, কোথায় ছুটছে সে জানে না। এক অজানা ভয়ে, আতঙ্কে সে বাসে, ট্রেনে যাত্রা শুরু করলো। তার যাত্রে শেষ হলো তখন, যখন সে নিজেকে নিরাপদ মনে করলো। তখনও সং এর বেশেই ছিলো চাঁন মিয়া, এতক্ষণ হুঁশ ছিলো না সেদিকে। অদ্ভুত এক শান্ত পরিবেশে সে নিজেকে আবিষ্কার করল, কোথায় এসেছে বুঝতে পারল না। জলদি মুখের রং, সং এর পোশাক পরিবর্তন করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। হাঁটতে হাঁটতে একটা পুকুরের ধারে এলো চাঁন মিয়া। হঠাৎ মনে পড়ল তার পকেটে সং এর মুখে মাখার জন্য কিছু গুড়ো রং এর প্যাকেট ছিলো। বিরক্তিতে ছেয়ে গেল সেই মূহুর্ত, এই অভিশপ্ত জীবন যেন পিছুই ছাড়ছে না। অদূরে এক ছোট্ট শিশু অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছিলো কিন্তু ছেলেটির মা কাপড় কাচতে ব্যাস্ত, ছেলেটির দিকে তাকানোরও সময় নেই, এরই নাম জীবন যন্ত্র,যখন প্রতুলি মূহুর্ত বেচে থাকার সব মমতা অচল হয়ে পড়ে। চাঁন মিয়া তার কাছে থাকা অবশিষ্ট রং গুলো ক্রন্দনরত ছেলেটির কাছে গিয়ে মাটিতে একটা ছবি আঁকল। ছবি দেখে শিশুটির হাসির আভায় যেন প্রশান্তি খুঁজে পেল চান মিয়া। কিন্তু সে তখনো বুঝতে পারে নি যে এই হাসির আভায় তার ভবিষ্যৎ জীবনের সূচনা।


Contributor:

Sadia Mahjabin Nishat
Department of Women and Gender Studies
3rd Year
University of Dhaka

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party