রুপাই

FB_IMG_1590668896381-e1593274190657
JSC / পদ্য / বাংলা

রুপাই

মূলভাব :

রুপাই’ কবিতার চাষির ছেলে রুপাইয়ের গায়ের রং কালো হলেও কর্মদক্ষতায় তার জুড়ি মেলা ভার। রুপাইয়ের মতো গ্রামবাংলার কৃষকের শরীরের রং রোদে পুড়ে কালো হয়। এ কালো কালি দিয়েই পৃথিবীর সব কিতাব-কোরআন লেখা হয়ে থাকে বলে এ কৃষককুলকে অবজ্ঞা করার কোনো কারণ নেই। রুপাইয়ের দৈহিক কাঠামো ও শক্তি-সামর্থ্যকে পাগাল লোহা বা ইস্পাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কৃষক রুপাই রৌপ্য ধাতু দিয়ে গড়া না হলেও মানুষ হিসেবে কৃষককুলে সে অমূল্য রতন। কারণ তার মতো কৃষকের শ্রমে ও ঘামে মানবসভ্যতার ইতিহাস রচিত হয়েছে।কচি, সবুজ ধানের চারা তুলতে গিয়ে কৃষকের হৃদয়ের সুখের অনুভূতি তার সারা মুখে যেমন হাসি হয়ে ফুঠে উঠে, সেই হাসির কতকটা রুপাই তার মুখে ধরে রেখেছে। রুপাইয়ের রূপের এই বৈশিষ্ট্য পল্লী প্রকৃতির সাধারণ চিত্র।

লেখক পরিচিতি :

> কবি জসীমউদ্দীন ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে ১৯০৩ খিস্ট্রাব্দে জন্মগ্রহণ করেন।

>১৯৩১ খিস্ট্রাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যের উপর এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

>ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন ৫ বছর।

>পরবর্তীতে সরকার এর তথ্য ও প্রচার বিভাগে উচ্চপদে যোগদান করেন।

>ছাত্রজীবনেই তাঁর কবিতা লেখার হাতেখড়ি শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ‘কবর’ কবিতাটি প্রকাশ হলে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

>তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য  – পল্লিমানুষ ও গ্রামীণ প্রকৃতি।

>কাহিনীকাব্য : নক্সী কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট।

> কাব্যগ্রন্থ : রাখালী, বালুচর, মাটির কান্না

> উপন্যাস : বোবা কাহিনী।

>গানের সংকলন :  রঙিলা নায়ের মাঝি

>শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ : হাসু, এক পয়সার বাঁশি, ডালিমকুমার।

>তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি এবং বাংলাদেশ সরকার এর একুশে পদক লাভ করেন

>১৯৭৬ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

রচনার পরিচিতি :

 রুপাই কবিতাটি  ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম থেকে সংকলিত হয়েছে।

কবিতার ব্যাখা :

এই গাঁয়ের এক চাষার ছেলে লম্বা মাথা চুল,

কালো মুখের কালো ভ্রমর, কিসের রঙিন ফুল।

কাঁচা ধানের পাতার মতো কচি-মুখের মায়া,

তার সাথে কে মাখিয়ে দেছে নবীন তৃণের ছায়া

>কবি এখানে গ্রাম বাংলার একজন সহজ-সরল কৃষকের বর্ণনা দিয়েছেন যার মাথায় লম্বা চুল, মুখের রঙ কালো ঠিক যেন ভ্রমের মত। যা রঙিন ফুলের চেয়েও বেশি সুন্দর। কৃষক ছেলেটির মুখের মায়াকে কবি কাঁচা ধানের সজীবতার সাথে তুলনা করেছে। তাঁর শরীরে নতুন ধানের সতেজতার ছায়া যেন পড়ে আছে।

জালি লাউয়ের ডগা মতো বাহু দুখান সরু,

গা খানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু।

বাদল ধোয়া মেঘে কে গো মাখিয়ে দেছে তেল,

বিজলি মেয়ে পিছ্‌লে পড়ে ছড়িয়ে আলোর খেল।

> কৃষক ছেলেটির বাহু দুটি যেন কচি লাউের ডগার মত মনে হয় কবির কাছে। আর তাঁর শরীরটা যেন ঠিক শ্রাবন মাসের তমাল গাছের মত কালো। কৃষক বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে কাজ করে খালি গায়ে, আর হঠাৎ  তখন বিদ্যুৎ চমকালে মনে হয় তাঁর গায়ে আলোর খেলা হচ্ছে।

কচি ধানের তুলতে এক্সারা হয়তো কোন চাষি,

মুখে তাহার জড়িয়ে গেছে কতকটা তার হাসি ।

কালো চোখের তারা দিয়ে  সকল ধরা দেখি,

কালো দাতের কালী দিয়েই কেতাব কোরান লেখি।

>কালো কৃষকটি দিন-রাত জুড়ে মাঠে ফসল উৎপাদন এর জন্য কাজ করে। যখন সে ধানের চারা তুলে তাঁর খুশির শেষ থাকে না। রোদে পুড়ে তাঁর শরীর কালো হয়ে যাই মানবজাতির কল্যাণের জন্য। এই কালো কালি দিয়েই পৃথিবীর সমস্ত কেতাব বা গ্রন্থ লেখা হয়ে থাকে।

জনম কালো, মরন কালো, কালো ভূবনময়;

চাষিদের ওই কালো  ছেলে সব করছে জয়।

সোনায় যে জন সোনা বানায়, কিসের গরব তার”

রং পেলে ভাই গড়তে পারি রামধনুকের হার।

>জগতের যেন সবকিছুই কালোময় কৃষকের। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। কালো কৃষক ছেলেটি তাঁর কৃতকর্মের মাধ্যমে জগতের সবকিছু জয় করেছে। কারণ, তাঁর শ্রমের সভ্যতার  গর্বের ইতিহাস সৃষ্টি করে যা স্বর্ণ কিংবা রঙ দিয়ে তা অর্জন করা সম্ভব না।

কালোয় যে জন আলো বানায়, ভুলায় সবার মন,

তারির পদ রজের লাগি লুটায় বৃন্দাবন।

সোনা নহে, পিতল নহে, নহে সোনাএ মুখ,

কালো বরন চাষির ছেলে জুড়ায় যেন বুক।

> কৃষকটার কালো রঙ দিয়েই জগতের সবার কাছে আলো পৌঁছে দিয়ে থাক তাঁর পরিশ্রমের ফসলের মাধ্যমে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সচল রাখতে তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অবদান বৃন্দাবনের মত পবিত্র এবং সোনার চেয়েও দামী।

যে কালো তার মাঠেরি ধান, যে কালো তাঁর গাও।

আখড়াতে তার বাঁশের লাঠি অনেক মানে নামী,

খেলার দলে তারে নিয়েই সবার টানাটানি।

জারির গানে তাহার গলা উঠে সবার আগে,

শাল-সুন্দি-বেত যেন ও, সকল কাজেই লাগে।

>কৃষক তাঁর কালো শরীরের পরিশ্রম দিয়ে মাঠে ধান উৎপাদন করে। এই কালো কৃষকটি আখড়ার খেলা, জারির গানে যেমন পারদর্শী তেমনি সব কাজেই পারদর্শী। শালগাছ,শ্বেতপদ্ম, বেত যেমন সব কাজে লাগে,তেমনি কৃষকরাও সব কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বুড়োরা কয়, ছেলে নয় ও পাগাল লোহা লাগে।

রুপাই যেমন বাপের বেটা কেউ দেখছ হেন?

যদিও রুপা নয়কো রুপাই , রুপার চেয়ে দামি,

এক কালেতে ওরই নামে সব গাঁ হবে নামি ।

>গ্রামের বৃদ্ধ লোকেদের মতে,কৃষক ছেলেটি যেন ইস্পাতের মত মূল্যবান। এই ছেলেটির নাম হচ্ছে রুপাই যার রুপা নেই কিন্তু রুপার চেয়েও দামী। একদিন এই কালো ছেলেটি সবার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তুু হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।

বৃন্তি সাহা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়     

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party