মানবধর্ম

JSC / পদ্য / বাংলা

মানবধর্ম

কবিতার ব্যাখা:

সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।

লালন কয়, জেতের কী রূপ, দেখলাম না এ নজরে ।।

>এই দুটি লাইন দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে,সমাজের সকলে লালনকে কোন  ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষ বলে প্রশ্নবিদ্ধ করে৷ কিন্তু লালন মনে করে, এই সমাজে মানুষের কোন আলাদা জাতের পরিচয় নেই। সবার একটাই পরিচয় মানুষ।

কেউ মালা, কেউ তস্‌বি গলায়,

তাইতে কী জাত ভিন্ন বলায়,

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জেতের চিহ্ন রয় কার রে।।

> এই স্তবকে দেখা যায়, মালা, তসবি ইত্যাদি চিহ্ন দ্বারা মানুষকে বিভিন্ন ধর্ম -বর্ণে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের জন্ম কিংবা মৃত্যুর সময় ধর্ম-বর্ণের কোন চিহ্ন নিয়ে আসে না। জাতের চিহ্ন সমাজের কারো মধ্যেই প্রকৃতভাবে থাকে না৷

গর্তে গেলে কূপজল কয়,

গঙ্গায় গেলে গঙ্গাজল হয়,

মূলে এক জল, সে যে ভিন্ন নয়,

ভিন্ন জানায় পাত্র-অনুসারে।।

>এই স্তবকটি পরে বোঝা যায়, জল স্থান-পাত্র ভেদে ভিন্ন হয় তাই তার নামও দেওয়া হয় ভিন্ন। এখানে জল দ্বারা মানুষকে বোঝানো হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন ধর্মে জন্ম গ্রহণ করে বলে তার জাত পরিচয় হয় ভিন্ন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের মানবধর্ম বা মনুষ্যধর্ম তাঁর আসল পরিচয়।

জগৎ বেড়ে তেজের কথা,

লোকে গৌরব করে যথা-তথা,

লালন সে জেতের ফাতা

বিকিয়েছে সাত বাজারে।।

>সর্বশেষ স্তবকটি পড়ে বোঝা যায়, জগতে মানুষের সৃষ্টি করা ধর্ম-বর্ণ,গোত্রে ভরপুর।  মানুষ অযথা জাত ধর্ম নিয়ে গৌরব করে যা মূল্যহীন৷ লালন এই জাত-ধর্মের বৈশিষ্ট্য দূর করেছেন তার অধ্যাত্মাতিক চিন্তার মাধ্যমে। তাঁর প্রতিটি গানের মাধ্যমে মানবধর্মের কথা স্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছেন।

মূলভাব :

বিখ্যাত বাউল সাধক সুর সম্রাট লালন শাহের ‘মানবধর্ম’ কবিতাটি মূলত একটি গানের সংকলন। গানটি এখানে কবিতা আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ কবিতায় লালন শাহ্ মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে একত্রে বসবাসের কথা বলেছেন। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ প্রভৃতির ঊর্ধ্বে ওঠে মানবধর্ম প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন। কবিতাটিতে সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ‘মানবধর্ম’ এর জয়গান করা হয়েছে। এ পৃথিবীর সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। সৃষ্টিকর্তা সকল মানুষকে সমান করে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের জীবনকে সুন্দর ও স্বার্থক রূপে গড়ে তুলতে মানবধর্মের অনুসরণ করা উচিত। লালনের দর্শনকে অন্তরে ধারণ করা উচিত। তবেই আমাদের সমাজ, দেশ তথা পৃথিবী হয়ে ওঠবে ভেদাভেদহীন ও বৈষম্যহীন।

লেখক পরিচিতি:

>লালন শাহ্ মরমি কবি। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ বাউল সাধক। তাঁর জন্মতারিখ ও জন্মস্থান নিয়ে পণ্ডিতগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তিনি ১৭৭২ খ্রি: ঝিনাইদহ মতান্তরে কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

 >তিনি ছেলেবেলায় বাউল সাধক সিরাজ শাহের কাছে আধ্যাত্মিক তত্ত্বে দীক্ষা নেন। আর সেজন্যই তিনি ‘শাহ্’ উপাধি লাভ করেছিলেন।

>লালন শাহ্ নানা ধর্মগ্রন্থ, ষড়দর্শন, স্মৃতিশাস্ত্র প্রভৃতি বিষয়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করেন। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও নিজের চিন্তা

সাধনায় হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় শাস্ত্র সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। এই জ্ঞানের সাথে নিজের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির মিলনে নতুন এক দর্শন প্রচার করেন। গানের মধ্যে দিয়ে তাঁর এ দর্শন প্রকাশ পেয়েছে।

>তিনি কায়মনোবাক্যে গান ও আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল গান। তিনি ছিলেন সুরের সাধক।  সহস্রাধিখ গান রচনা করেছেন। অধ্যাত্মভাব ও রসব্যঞ্জনা ছিল কার গানের বৈশিষ্ট্য।

>তিনি ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রি: কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় পরলোকগমন করেন।

বৃন্তি সাহা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়    

Comment (1)

  1. Robi Boss

    this system was so nice

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party