বিড়াল – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

HSC / গদ্য / বাংলা ১ম পত্র

বিড়াল – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

12 / 100

লেখক পরিচিতি:

জন্ম : ২৬ জুন ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ
জন্মস্থান : কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ
উপাধি : সাহিত্যসম্রাট
ছদ্মনাম : কমলাকান্ত
গ্রন্থ সংখ্যা : ৩৪
প্রথম উপন্যাস : Rajmohon’s Wife
প্রথম বাংলা উপন্যাস : দুর্গেশনন্দিনী
অন্যান্য উপন্যাস : কপালকুন্ডলা, মৃণালিনী, বিষবৃক্ষ , কৃষ্ণকান্তের উইল, ইন্দিরা, আনন্দমঠ, চন্দ্রশেখর, সীতারাম, দেবী চৌধুরাণী, রাজসিংহ প্রভৃতি।
প্রবন্ধ : লোক রহস্য, বিজ্ঞানরহস্য, সাম্য, কৃষ্ণচরিত্র, বিবিধ প্রবন্ধ, কমলাকান্তের দপ্তর ( ৩ অংশে বিভক্ত)
মৃত্যু : ৮ এপ্রিল, ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দ

গল্পের মূলভাব :

দূর্দশাগ্রস্ত বিড়ালের মুখ দ্বারা তৎকালীন ভারতবর্ষে ইংরেজদের শোষণ পরোক্ষভাবে লেখক প্রকাশ করেছেন । তাছাড়া সমাজে ধনীদের দৌড়াত্ব ও দরিদ্রদের কষ্টও প্রকাশ পেয়েছে এই প্রবন্ধে।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইনের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা:

” দেয়ালের উপর চঞ্চল ছায়া প্রেতবত নাচিতেছে ”

➤ মিট মিট করে ক্ষুদ্র আলো জ্বলছিল, সেই আলোর ছায়া দেয়ালে দেখতে এমন মনে হচ্ছিল যেন ভূত-প্রেত নাচছে।

“আমি যদি নেপোলিয়ন হইতাম, তবে ওয়াটারলু জিতিতে পারিতাম কিনা “

➤ কমলাকান্ত চেয়ারের উপর বসে হুঁকা হাতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঝিমাচ্ছিলেন। রাতের খাবার তখনও প্রস্তুত হয় নি। তিনি তখন নেশাগ্রস্ত বিধায় মাথায় এক উদ্ভট চিন্তা নিয়ে আসেন। তিনি ভাবতে থাকেন যদি তিনি নেপোলিয়ন হতেন তবে ওয়াটারলু জিতিতে পারতেন কিনা?

  • এখানে নেপোলিয়ন ও ওয়াটারলু হচ্ছে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন যিনি প্রায় সমগ্র ইউরোপে নিজের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে ওয়েলিংটন ভিউকের হাতে নিহত হয়ে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই মৃত্যু বরন করেন।

” ওয়েলিংটন হঠাৎ বিড়ালত্ব প্রাপ্ত হইয়া, আমার নিকট আফিং ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে “

➤ কমলাকান্ত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কিছু উদ্ভট চিন্তা করছিলেন। তিনি নিজেকে নেপোলিয়ন ভেবে ওয়াটারলু জয় করার কথা ভাবছিলেন। এমন সময় বিড়ালের ডাক শুনে ভাবলেন ওয়েলিংটন বোধ হয় মানুষ থেকে বিড়ালে পরিণত হয়েছে। অতঃপর তার নিকট আফিং চাইতে এসেছে।

ওয়েলিংটন : একজন ঐতিহাসিক বীর যোদ্ধা যার হাতে নেপোলিয়ন পরাজিত হয়েছিল ওয়াটারলু যুদ্ধে। তিনি ভিউক অফ ওয়েলিংটন নামে পরিচিত।

“ভিউক মহাশয় কে যথোচিত পুরস্কার দেয়া গিয়েছে, এক্ষনে আর অতিরিক্ত পুরস্কার দেয়া যাইতে পারে না। বিশেষ অপরিমিত লোভ ভালো নয় “

➤ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে হারানোর পর ভিউক অফ ওয়েলিংটনকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। কমলাকান্তের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ধারণা ছিল ওয়েলিংটন বিড়ালে পরিণত হয়ে তার নিকট আফিং চাইতে এসেছে, যেহেতু ওয়েলিংটন কে আগেই যথেষ্ট পুরস্কার দেয়া হয়েছে তাই এখন আর পুরস্কার হিসেবে আ

“আমি তখন ওয়াটারলুর যুদ্ধে ব্যূহ –রচনায় ব্যাস্ত ”

➤কমলাকান্ত বিড়ালের ডাক শুনে যখন চোখ খুলল, তখন দেখল এতক্ষন তার কল্পনা ছিল ভুল। ওয়েলিংকটন নয় বরং একটি বিড়াল তার জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলছে। তিনি তা খেয়াল করেন নি কারণ তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নিজেকে নেপোলিয়ন ভেবে ওয়াটারলুর ময়দানে সৈন্য সাজাচ্ছিলেন।

ব্যূহ রচনা : যুদ্ধের জন্য সৈন্য সাজানো।

” কেহ মরে বিল ছেঁচে কেহ খায় কই “

➤ কথাটির অর্থ কিছুটা এরকম, কারো পরিশ্রমের ফল বিনা পরিশ্রমে অন্যজনের ভোগ করা। এ কথাটি বিড়ালের মেও শব্দে এবং অঙ্গভঙ্গিতে কমলাকান্ত ধারণা করেন। কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধ বিড়াল খেয়ে ফেলার পর কমলাকান্তের ধারণা তার দিকে তাকিয়ে এরকম চিন্তা করছিল বিড়ালটি।

” আমারও যে অধিকার, বিড়ালেরও তাই ”

➤ কমলাকান্তের দুধ বিড়ালটি খেয়ে ফেলার পর কমলাকান্ত কিছু যুক্তি দ্বার করায়। এই দুধ তো মঙ্গলা গাভীর। দুধ দুহিয়াছে দুধওয়ালী যার নাম প্রসন্ন। এ দুধ তো কারো ব্যক্তিগত খাবার নয় বরং পান করার ব্যাপারে কমলাকান্ত ও বিড়ালের সমান অধিকার রয়েছে।

“পুরুষের ন্যায় আচরণ করাই বিধেয় “

➤ সাধারণত বিড়াল কিছু খেয়ে গেলে মানুষ তাকে তাড়া করে যাকে কমলাকান্ত চিরাগত প্রথা বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ প্রথা অবমাননা করলে তথা বিড়ালটিকে না তাড়ালে যদি বিড়ালটি তার স্বজাতিদের কাছে কমলাকান্তের এই কাপুরুষের ন্যায় আচরণের কথা বলে দেয়। এই আশংকায় কমলাকান্তের নিকট তখন বিড়ালটিকে তাড়িয়ে দেয়াটাই শ্রেয় মনে হল।

“বিজ্ঞচতুষ্পদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ ব্যতীত তোমাদের জ্ঞানোন্নতির উপায়ান্তর দেখিনা”

➤ বিড়ালটি মারপিট বন্ধ কবে কমলাকান্তকে একটু বিচার করতে বলল তথা এক ধরনের নালিশ করলো। তার দাবি মানুষের ন্যায় তাদেরও ক্ষুধা ও পিপাসা আছে। মানুষ খাদ্য গ্রহণের সময়তো কোন বিড়াল প্রতিবাদ করে না। অথচ বিড়ালেরা খাদ্য গ্রহণ করলেই মানুষেরা বুদ্ধি বিবেকহীনের ন্যায় বিড়ালদের মারতে উদ্ববুদ্ধ হয়। তাই মানুষের উচিত বিড়ালদের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়া।

“আমি তোমার ধর্ম স্বঞ্চয়ের মূলীভূত কারণ “

➤ বিড়ালের মতে পরোপকারই হলো পরম ধর্ম। বিড়ালটি কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধ খেয়েছে। ফলে কমলাকান্তের ধর্ম কেন্দ্রিক কর্মকান্ড সম্পাদিত হয়েছে। ফলে বিড়ালটি নিজেকে কমলাকান্তের ধর্মসঞ্চয়ের মূল কারণ হিসেবে দাবি করছে।

“অধর্ম চোরের নহে – চোরে যে চুরি করে, সে অধর্ম কৃপণ ধনীর। চোর দোষী বটে। কিন্তু কৃপণ ধনী তদপেক্ষা শতগুণে দোষী। চোরের দন্ড হয় ; চুরির মূল যে কৃপণ, তাহার দন্ড হয় না কেন? “

➤ বিড়ালের মতে অধর্ম চোরের নয়। অর্থাৎ দোষ চোরের না। কেননা, চোর চুরি করে দারিদ্রতার জন্য। আর এই দারিদ্রতার মূলে হলো কৃপণ ধনী। তারা যদি ঠিক মতো দান করতো বা গরীবদের সাহায্য করতো তাহলে দারিদ্রতা থাকতোনা। চোরের শাস্তি হয়, অথচ এই চুরির পেছনে যিনি মূল হোতা তার কোনো শাস্তি হয় না। কৃপন ধনীরা চোরের চেয়ে শতগুণে দোষী।

“তেলা মাথায় তেল দেয়া মনুষ্য জাতির রোগ “

➤ বিড়াল যেমন কমলাকান্তের অজান্তেই তাঁর জন্য রাখা দুধ খেয়েছে, তেমনি যদি কোনো সমাজপতি বা পন্ডিত এসে খেয়ে যেতেন তবে কমলাকান্ত তাকে আরো আপ্যায়ন করার চেষ্টা করতেন। অথচ তারা কেউই ক্ষুধার্ত নন। অপরদিকে বিড়ালটি ক্ষুধার্ত হলেও তাকে কেউ খেতে দেয় না বরং তাড়াবার জন্য ব্যাস্ত হয়ে যায় সবাই। এটিকেই বিড়াল উপমা স্বরুপ বলেছে তৈলাক্ত মাথায় তেল দেয়া, যে মাথায় তেল নেই সেদিকে না দৃষ্টিপাত করা মনুষ্য জাতির রোগ স্বরুপ।

” তাহাদের রূপের ছটা দেখিয়া অনেক মার্জার কবি হইয়া পড়ে “

➤ বিড়ালটি নিজের দুঃঅবস্থার কথা বলতে বলতে গৃহপালিত বিড়ালদের সাথে নিজের তুলনা দেয়। গৃহপালিত বিড়ালদের মালিকরা অত্যন্ত আদর যত্নের সাথে তাদের বড় করে। তাদের দেহ লোমপপূর্ণ। লেজ ফুলে থাকে। তাদের চেহারা দেখে নাকি অনেক রাস্তার বিড়ালও কবি হয়ে পরে। কথাটি লেখক হাস্য রসিকতা হিসেবে বলেছেন।

“তোমার কথাগুলো ভারি সোশিয়ালিস্টিক! সমাজ বিশৃঙ্খলার মূল ”

➤ এবার কমলাকান্ত মুখ খুললেন। তিনি বিড়ালটিকে থামতে বললেন। বললেন তোমার কথাগুলো সমাজতান্ত্রিক বা সমাজে সবাই সমান এরূপ সমর্খক। এসব কথাই সমাজ বিশৃঙ্খলার প্রধান কারণ। এ কথাটি দ্বারা লেখক পরোক্ষভাবে ইংরেজদের শোষণের কথা উল্লেখ করেছেন।ইংরেজরা বাঙালীদের দাস বানিয়ে রেখেছিল এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটাও ছিল শাস্তির কারণ। এ কথাটিই লেখক কমলাকান্তের মুখ দ্বারা প্রকাশ করেছেন।

” সমাজের ধনবৃদ্ধি অর্থ ধনীর ধন বৃদ্ধি ”

➤ সমাজের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় ধনীরাই এগিয়ে থাকে। কমলাকান্তের মতে যারা ধনী তাদের ধন সঞ্চয়ের ফলেই সমাজের উন্নতি হয়। এক্ষেত্রে বিড়াল দ্বিমত পোষণ করে এবং এতে দরিদ্রের কোনো লাভ হয়না বলে দাবি করে। অর্থাৎ আপাত দৃষ্টিতে সমাজের ধন বৃদ্ধি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে গরিবদের কোনো উপকার হয়না। এ কথা দ্বারা লেখক ইংরেজ শাসন চলাকালীন দরিদ্র মানুষদের অবস্থাকেও প্রকাশ করেছেন।

“এ সকল অতি নীতি বিরুদ্ধ কথা, ইহার আন্দোলনেও পাপ আছে “

➤ বিড়াল যে কথাগুলো বলেছিল শেষ পর্যন্ত, সে কথাগুলো ছিল বাস্তবসম্মত। তার কথায় পরোক্ষভাবে লেখক দরিদ্র মানুষদের উপর ইংরেজদের শাসনের নামে শোষণ প্রকাশ পায়, যার আন্দোলন করা তৎকালীন সময়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রবন্ধে লেখক অন্যভাবে প্রকাশ করলেও মূল বক্তব্য এটাই।

” আফিমের অসীম মহিমা বুঝতে পারবে “

➤ কমলাকান্ত শেষ পর্যন্ত বিড়ালটিলে এসব অতি জ্ঞানী কথা বলা বাদ দিয়ে অন্য কাজের প্রতি মনোযোগ দেয়ার আহবান জানান। এসময় কমলাকান্ত তার দপ্তরটি পড়তে বলেন। কমলাকান্ত সবসময় গাঁজা বা আফিং খেয়ে দপ্তরে লেখা লেখি করতো। তাঁর চিন্তা ভাবনা ও দপ্তরের লেখাগুলোও তাই ছিল উদ্ভট। এ জন্যই তার দপ্তর পড়লে বোঝা যাবে মানুষ আফিং খেয়ে কতটা উদ্ভট কথাবার্তা লেখতে পারে।

” পতিত আত্মাকে অন্ধকার হইতে আলোতে আনিয়াছি “

➤ বিড়ালের সাথে তার কথোপকথন ছিল কাল্পনিক। আফিং খেয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে এক বিড়ালের সাথে কাল্পনিক ভাবে কথা বলার মাধ্যমে সমাজে বিড়ালদের অবস্থান ও সামাজিক বিষয়ে তাদের মাঝে কথাবার্তা হয়। মূলত ইংরেজদের অত্যাচার প্রকাশ করাটাই ছিল এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। এরকম দূর্দশাগ্রস্ত আত্মার সাথে কথা বলে তার মনোভাবকে উপলব্ধি করতে পেরে কমলাকান্ত এ উক্তিটি করেছেন।

⊕ ‘বিড়াল’ প্রবন্ধ সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা :
১) অনেকেই মনে করে ‘বিড়াল’ কোনো গল্প। এটি কোনো গল্প বা নাটক নয় বরং এটি একটি প্রবন্ধ।

২) অনেকেই পরীক্ষার খাতায় কমলাকান্তকে লেখক বলে আখ্যা দেন, তিনি আসলে ব্রঙ্কিমচন্দ্র নয়। তাই আমাদের সব সময় কমলাকান্তের নাম উল্লেখ করতে হবে। মনে রাখতে হবে বিড়ালের সাথে কমলাকান্তের কথোপকথন হয়েছিল, লেখকের নয়।

প্রবাদ বাক্য:

১) তেলা মাথায় তেল দেয়া।
২) কেহ মরে বিল সেঁচে, কেহ খায় কই।

প্রবন্ধের গুরুত্বপূর্ণ টপিকস (সৃজনশীল / CQ অংশের জন্য)

প্রবন্ধে বর্ণিত সবল শ্রেণি কর্তৃক দুর্বল শ্রেণির শোষণের রূপ।
শোষিতদের প্রতি সমাজের সহমর্মিতা
বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সমাজের সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা।
সমাজের নানা অসংগতি নিয়ে বিড়াল তথা লেখকের মনোভাব।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party