নারী

JSC / পদ্য / বাংলা

নারী

কবিতার মূলভাব:

সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিরচিত ‘নারী’ কবিতাটিতে কবি মানবসভ্যতা বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমান অবদানকে গুরুত্বারোপ করেছেন।

এ বিশ্বের যা কিছু মহান ও কল্যাণকর, সব সৃষ্টির মূলেই রয়েছে নারীর অসামান্য অবদান। অথচ এ দেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের রাখা হয়েছে কোণঠাসা করে। নারীর স্বতন্ত্র সত্তার কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। নারীকে কখনো কন্যারূপে, কখনো মাতারূপে, কখনো পত্নীরূপে গণ্য করা হয়েছে। কোনো সংগ্রামের ইতিহাসে পুরুষের রক্তপাতের কথা লেখা থাকলেও নারীর বিধবা হওয়ার বেদনাকে স্থান দেওয়া হয়নি। মায়ের হূদয় উজাড় করা স্নেহ-মমতাকে আশীর্বাদ মেনে, প্রিয়তমা স্ত্রীর অনুপ্রেরণা এবং ভালোবাসাকে হূদয়ে ধারণ করে যে বীর যুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছেন, তার নামটি স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেখা থাকলেও ওই নারীর নামটি কোথাও উল্লেখ থাকে না। এভাবেই নারীকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে নারীরা আজ সে অন্ধকার দুর্ভেদ্যকে অতিক্রম করে সম্মুখে অগ্রসর হয়েছে। বন্দিত্বের শৃঙ্খল ভেঙে আজ তারা মুক্তির লক্ষ্যে সোচ্চার। নারী শুধু পুরুষের সহচরী নয়, সে সহকর্মী এবং সহযোগী হিসেবে দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।

রচনার উৎস:

‘নারী’ কবিতাটি  কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সাম্যবাদী’ থেকে সংকলিত।

কবিতার ব্যাখা:

সাম্যের গান গাই-

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।

বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

> কবি তাঁর সকল কবিতায় নর-নারীর সাম্য বা সম অধিকারের কথাটি সুপষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেন। তাঁর দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ থাকতে নেই। সবার অধিকার সমান। এই বিশ্বের যত কল্যাণময় সৃষ্টি আছে তাঁর পিছনে অর্ধেক অবদান যেমন পুরুষের তেমনি অর্ধেক অবদান নারীর।

বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি

অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।

জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান

মাতা ভগ্নী ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।

>এই পৃথিবীতে যা কিছু দুঃখ-কষ্ট, চোখের জলের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে তাঁর সমান অংশীদার নারী -পুরুষ উভয়ই। পৃথিবীর যত বড় বড় যুদ্ধ-অভিযানে বিজয় অর্জন হয়েছে তাঁর পিছনে ছিল নারীদের আত্মত্যাগ। তাঁদের আত্মত্যাগই মহান করেছে বিজয়কে।

কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,

কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি কত বোন দিল সেবা,

বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?

>পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু পুরুষদের আত্মত্যাগ লেখা আছে। কত জন পুরুষ যুদ্ধে শহীদ হয়েছে স্পষ্ট করে লেখা আছে কিন্তু লেখা হয়নি কত জন নারী তাঁদের স্বামীকে হারালো। মায়েরা হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করেছে, বোনের বীর ভাইদের যুদ্ধে সেবা করেছে। তবুও স্তম্ভে লেখা হয়নি নারীদের অবদান।

কোনো কালে একা হয় নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি,

প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।

> আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে তাঁর পেছনে নারী-পুরুষের সমান কৃতিত্ব রয়েছে। নারীদের অনুপ্রেরণা, সাহস-উদ্দীপনা ছাড়া একা পুরুষের পক্ষে জয় লাভ করা সম্ভব না। নারীদের এই   অনুপ্রেরণা, সাহস কে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

              সে-যুগ হয়েছে বাসি,

যে যুগে পুরুষ দাস ছিল নাকো, নারীরা আছিল দাসী।

বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,

কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি।

>এমন এক সময় ছিল যখন নারীরা পুরুষদের দ্বারা অবহেলিত, নির্যাতিত হতো। পুরুষরা ছিল শাসক। কিন্তু সময় এখন বদলে গেছে। চারপাশে এখন জয়ের ধ্বনি।  সময় এখন সমতা নিশ্চিত করার। নারীরা এখন আর বন্দী থাকবে না। নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানবসভ্যতা বিনির্মান করবে।

নর যদি রাখে নারী বন্দি, তবে এর পরযুগে

আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে।

যুগের ধর্ম এই –

পীড়ন করিলে সে-পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।

>কোন কাজই নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব না। পুরুষ যদি নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখে বিনিময়ে সে পুরুষ অন্ধজগতে থেকে সমাজকে অধঃপতনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বর্তমান যুগে কোন পুরুষ যদি নারীকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে অযথা কষ্ট দেয় তাহলে সেই দুঃখ-বেদনা বিনিময়ে পুরুষের প্রাপ্ত হবে। কারণ, সময় এখন সমতার।

বৃন্তি সাহা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়     

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party