দুই বিঘা জমি

Mohsanat Ibni Aual
JSC / পদ্য / বাংলা

দুই বিঘা জমি

কবিতার মূলভাব :

 ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতায় শোষক শ্রেণির শোষণ ও গরিবদের দুর্দশা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।  এখানে জমিদার বাবুর চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিষ্ঠুরতা, পাশবিকতা ও মানবতাবোধহীনতার পরিচয় পাই। আর উপেন হল নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত ও দুর্ভাগ্যের শিকার নিরীহ এক মানবের করুণ কাহিনী।

এই কবিতার মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন সমাজে এক শ্রেণির লুটেরা বিত্তবান প্রবল  অর্থ, শক্তি ও দাপটের জোরে অন্যায়কে ন্যায় ও ন্যায়কে অন্যায় বলে প্রতিষ্ঠা করে। তাছাড়া সম্পদের মালিকরা আরো সম্পদ আহরণের জন্য কীভাবে লালায়িত হয় সেই বিষয়টিও এখানে উঠে এসেছে।

রচনার উৎস:

 ‘দুই বিঘা জমি’ মূলত একটি কাহিনী কবিতা। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী ‘ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগ্রহীত হয়েছে।

লেখক পরিচিতি:

> রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ, ১২৬৮ সালে (৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

>তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।

>তিনি বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি, কিন্তু সাহিত্যের বিচিত্র ক্ষেত্রে তাঁর পদচারণা সত্যিই বিস্ময়কর।

>প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানী ছিলেন বলে বাল্যকালেই তাঁর কবিপ্রতিভার উন্মেষ ঘটে। মাত্র পনের বছর বয়সে তাঁর ‘বনফুল’ কাব্য প্রকাশিত হয়।

> ১৯১৩ সালে রবি ঠাকুর প্রথম এশীয় হিসেবে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

> উপাধি : বিশ্বকবি,বিশ্বনন্দিত কবি, কবিগুরু

>তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সকল শাখায় অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর সাহিত্য খ্যাতি গোটা বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

> তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, গায়ক, নাট্য প্রযোজক ও অভিনেতা। সাহিত্যের সকল শাখা তাঁর হাত ধরেই সফলতা পেয়েছে।

>আমাদের দেশের জাতীয় সঙ্গীত তাঁর লেখা।

>উপন্যাস : চোখের বালি,ঘরে বাইরে, শেষের কবিতা, গোরা, যোগাযোগ ইত্যাদি।

>কাব্যগ্রন্থ : সোনার তরী, ক্ষণিকা, সেঁজুতি, শেষ লেখা, পুনশ্চ ইত্যাদি।

>নাটক : চিত্রগঙ্গা, বির্সজন, বাল্মীকিসভা,চিরকুমার  ইত্যাদি।

>১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই আগস্ট (১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২শে শ্রাবণ) মৃত্যুবরণ করেন।

কবিতার ব্যাখা :

পার্ট  (১)

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই আর সবই গেছে ঋণে।

বাবু বলিলেন, বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।

কহিলাম আমি, তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।

চেয়ে দেখো মোর আছে বড়ো-জোর মরিবার মতো ঠাঁই।

>উপেন একজন সমাজের বিত্তহীন শ্রেণির প্রতিনিধি। তাঁর দারিদ্র্যের কষাঘাতে সকল জমি ঋণে বিলীন হয়ে গেছে।  শুধু বাকি দুই বিঘা জমি৷ সেটাও এখন বিত্তশালী জমিদারের নজরে। উপেন অনেক মিনুতি করে তাঁর দুর্দশার কথা বলে। কারণ,এই জমি ছাড়া তাঁর আর কোনো জায়গা নেই।

শুনি রাজা কহে, বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,

পেলে দুই বিঘে প্রস্থ ও দিঘে সমান হইবে টানা-

ওটা দিতে হবে। কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি

সজল চক্ষে, করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।

> জমিদার তাঁর বাগান এর দৈর্ঘ প্রস্থ সমান করার জন্য উপেনের জমি কিনে নিতে চায়৷ কিন্তু এই জমি উপেনের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। তাই উপেন আবারও আকুতি মিনুতি করে জমিদার এর কাছে জমিটি না কেনার জন্য।

সপ্ত পুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,

দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!

আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,

কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, আচ্ছা, সে দেখা যাবে।

>এই দুই বিঘা জমিতে জড়িয়ে আছে উপেনের সাত পুরুষের স্মৃতি। তার কাছে এই জমি সোনার চেয়ে দামী। দারিদ্র্যের কারণে জমি বিক্রি করে কার মাতৃতুল্য জমিকে লক্ষ্মীছাড়া করতে চায় না৷ এসব শুনে জমিদার নীরবে নিষ্ঠুর হাসি হাসে।

পার্ট (২)

পরে মাস দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-

করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।

এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

>জমিদার ষড়যন্ত্র করে উপনকে মিথ্যার মামলার নাম দিয়ে দুই বিঘা জমি কেড়ে নেয়৷ জমিদারের বহু জমি থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্বলটুকু কেড়ে নেয়।

মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,

তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।

সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য

কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য!

>বাসস্থান শুন্য হয়ে উপেন এখন সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। আর নিজেকে সৃষ্টিকর্তা তাকে পুরো বিশ্বটায় লিখে দিয়েছে।যখন যেখানে খুশি যেতে পারছে।

ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি

তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।

হাটে মাঠে বাটে এই মতো কাটে বছর পনেরো-ষোল –

একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হলো।

>দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করতে করতে উপেনের পনেরো-ষোল বছর চলে যায়৷ তবুও মন থেকে দুই বিঘা জমিকে ভুলতে পারে না৷ তাঁর জমির কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে হলো।

নমঃনমঃনমঃ সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!

গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর, জীবন জুড়ালে তুমি।

অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধূলি

ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।

>গ্রামের দুই বিঘা জমি ছিল তার মায়ের মত৷ উপেন মনে করে মা যেমন তার সন্তান কে স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখে তেমনি এই জমির পরিবেশ ও তাকে সন্তানের মত আগলে রেখেছিল।

পল্লবঘন আম্রকানন রাখালের খেলাগেহ,

স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল-নিশীথশীতল স্নেহ।

বুকভরা মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে-

মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।

>উপেনের মনে পড়ে তাঁর গ্রামের চিরসবুজ প্রকৃতির কথা, কালো দিঘীর কথা৷ যেন তা শীতল স্নেহ দান করে৷ সেই দিঘীর জল বয়ে নিয়ে যাওয়া বধূদের দেখলে উপেনের মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।

দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে-

কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি রথতলা করি বামে,

রাখি হাটখোলা, নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে

তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।

>দুইদিন পর মধ্যাহ্নে উপেন প্রবেশ করে তার নিজগ্রামে৷ আশেপাশের বাড়ি ছাড়িয়ে নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছায়।

ধিক ধিক ওরে, শত ধিক তোরে, নিলাজ কুলটা ভূমি!

যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কী জননী তুমি!

সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা

আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফল ফুল শাক পাতা!

আজ কোন রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ-

পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!

>উপেন তাঁর দুই বিঘা জমির অবস্থা দেখে লজ্জা পেয়ে যায় এবং  লজ্জাহীন ভূমি বলে ভৎসর্না করে৷ কারণ, এক সময় উপেন তার দারিদ্র্য অবস্থায় মায়া-মমতায় তাঁর জমিকে ফুল, শাক-পাতা দিয়ে ভরিয়ে রাখতো৷ কোন অপূর্ণতা রাখতো না। কিন্তু আজ সেই জমি রাজার হাতে।

আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন-

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন।

ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন

কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সেদিনের কোনো চিহ্ন!

কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি!

যত হাসো আজ যত করো সাজ ছিলে দেবী, হলে দাসী।

>আজ দুই বিঘা জমি বিলাসিতার বেশে চেহারা ভিন্ন৷ চারপাশে এখন ফুল-পাতা। উপেনের সেই ভালোবাসা পূর্ণ পরিবেশ এখন আর নেই। উপেন যে দুই বিঘা জমির জন্য গৃহহীন হয়েছিল সেই জমি আজ ধনীর মালিকানায়। উপেনের কাছে মনে হয় তাঁতে প্রকৃত সৌন্দর্যবোধ ফুটে ওঠে না।

বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি-

প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আমগাছ, এ কি!

বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,

একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক-কালের কথা।

>উপেন চারিদিকে তাকিয়ে তাঁর ছোটবেলার কথা মনে করেলে  তখন চোখে পড়ে দেয়ালের পাশে একটি আমগাছের যেখানে আছে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি।

সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,

অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।

সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা পলায়ন-

ভাবিলাম হায় আর কী কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!

> উপেনের আম গাছ দেখে ছোটবেলা স্মৃতি স্মরণ করে৷ ছোটবেলায় দুপুরে স্কুল পালানো, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের রাতে আম কুড়ানো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়।

সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,

দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।

ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা,

স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।

>তখন হঠাৎ বাতাসের দোলায় দুটি পাকা আম গাছ থেকে উপেনের কাছে এসে পড়লো। উপেন মনে করে গাছটি তাঁকে চিনতে পেরে স্নেহ করে আমগুলো দান করলো। উপানে সম্মানে মাথা ঠিকায়।

হেনকালে হায় যমদূত প্রায় কোথা হতে এল মালী,

ঝুঁটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।

কহিলাম তবে, আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব-

দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব!

>হঠাৎ করে মালি এসে উপেনকে চোর বলে গালি দিয়ে তাচ্ছিল্য করে৷ উপেন তখন বলে, সে নীরবে তাঁর সবকিছু উজার করে দিলো আর সামান্য দুটি আমে অধিকার করাতে এত কলরব করে।

চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ

বাবু ছিপ হাতে পারিষদ সাথে ধরিতে ছিলেন মাছ।

শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, মারিয়া করিব খুন। বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ।

>উপেনকে না চিনে বিনাদোষে লাঠি হাতে জমিদার এর কাছে নিয়ে গেলো। তখন জমিদার তাঁর পরিষদের সাথে মাছ ধরছিলেন। ক্রোধে জমিদার উপনকে মারার হুমকি দেন৷ সাথে তার পরিষদ ও দ্বিগুণ সমর্থন করে।

আমি কহিলাম, শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!

বাবু কহে হেসে বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়।

আমি শুনে হাসি আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে-

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!

>উপেন আম দুটি জমিদার এর কাছে ভিক্ষে হিসেবে চাইলো।  বিপরীতে জমিদার তাঁকে চোর বলে গণ্য করলো। তখন উপেন দুঃখ-ভরা ক্রান্ত মন নিয়ে বলে, সে জমির মালিক হয়েও আজ চোর আর জমিদার ক্ষমতার বলে সাধু হয়ে গিয়েছে।

বৃন্তি সাহা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়    

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party