অধ্যায় ৩:( কুরআন ও হাদিস শিক্ষা )

JSC / ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা

অধ্যায় ৩:( কুরআন ও হাদিস শিক্ষা )

কুরআন ও হাদিস ইসলামি শরিয়তের প্রধান দুটি উৎস।ইসলামি শরিয়তের সকল বিধি-
বিধান ও নিয়ম পদ্ধতি মূলত এ উৎসদ্বয় থেকেই গৃহীত।কুরআন মজিদ ও হাদিস শরিফে
মানব জীবনের সকল সমস্যার মৌলিক নীতিমালা বর্ণনা করা হয়েছে।এসব মূলনীতির
আলােকেই ইসলামের সকল বিধি -বিধান প্রণীত হয়েছে।কুরআন ও হাদিসের নীতিমালার
বাইরে কোনাে কিছু ইসলামে গ্রহণযােগ্য নয়।

কুরআন মজিদ

পরিচয়
কুরআন শব্দটি আরবি কারউন শব্দমূল থেকে উদ্ভূত।কারউন অর্থ পড়া বা পাঠ
করা।অতএব,কুরআন শব্দের অর্থ হলাে পঠিত।আল-কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি
পঠিত কিতাব।প্রত্যেক দিনই লক্ষ-কোটি মুসলমান এ গ্রন্থ তিলাওয়াত করে থাকে।আমরা
পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে এ গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন সূরা ও আয়াত পাঠ করে থাকি।এ জন্য এ
কিতাবের নাম রাখা হয়েছে আল-,কুরআন।
ইসলামি পরিভাষায়,আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য হযরত জিবরাইল
(আ) এর মাধ্যমে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স)-এর উপর যে কিতাব নাজিল করেছেন
তাকেই আল-কুরআন বলা হয়।এটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। সর্বকালের
সকল মানুষের জন্য এ কিতাব হিদায়াতের উৎস।আল-কুরআন লাওহি মাহফুযে বা
সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ‌।‌‌এটি প্রথমে কদরের রাতে প্রথম আসমানের বায়তুল ইযযাহ
নামক স্থানে এক সাথে নাজিল করা হয়।মহানবি (স)-এর ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায়
ধ্যানমগ্ন থাকাকালে সর্বপ্রথম সূরা আলাকের ৫টি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তারপর প্রয়ােজন
অনুসারে অল্প অল্প করে নাজিল করা হয়।এভাবে ২৩ বছরে খণ্ড খণ্ড আকারে পুরাে
কুরআন নাজিল হয়।আল-কুরআনের সূরাসমূহ দুইভাগে বিভক্ত। যথা- মক্কি ও
মাদানি।মহানবি (স)আল্লাহর নির্দেশে নবুয়তের ত্রয়ােদশ বর্ষে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত
করেন।নবি করিম (স)-এর এ হিজরতের পূর্বে নাজিল হওয়া সূরাসমূহ মাক্কি সূরা হিসেবে
পরিচিত।এ সূরাসমূহে সাধারণত আকাইদ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে।যেমন-
তাওহিদ,রিসালাত,আখিরাত,বেহেশত-দোযখ, কিয়ামত ইত্যাদি হল মাক্কি সূরাগুলাের
বিষয়বস্তু। অন্যদিকে মহানবি (স)-এর মদিনায় হিজরতের পর নাজিলকৃত সুরাসমূহকে

মাদানি সূরা বলা হয়।এ সূরাসমূহে সালাত,যাকাত,সাওম,হজ,জিহাদ,হালাল-
হারাম,মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোেধ সম্পর্কিত বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।আল-
কুরআনের বেশ কিছু নাম রয়েছে।আলকুরআনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আলােকে এ
নামসমূহ রাখা হয়েছে। এগুলাে আল-কুরআনের বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন
করে।নিম্নে এর কতিপয় নাম উল্লেখ করা হলাে:
আল-ফুরকান (পার্থক্যকারী): আল-কুরআন সত্য-মিথ্যা,ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী।এ
জন্য একে আল-ফুরকান বলা হয়।

আল-হুদা (হিদায়াত,পথপ্রদর্শন):কুরআন মজিদের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্যের দিকে পথ
প্রদর্শন করা হয় বলে একে আল-হুদা নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আর রাহমাহ (রহমত,দয়া,করুণা ):পবিত্র কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য রহমত ও
করুণাস্বরূপ।তাই একে রাহমাহ বলা হয়েছে।

আয-যিকর (উপদেশ,আলােচনা):কুরআন মজিদে বহু ঘটনার আলােচনা ও বহু উপদেশ
রয়েছে।তাই একে যিকর নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আন-নুর (জ্যোতি,আলাে):পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে হালাল-হারামের রহস্য উদ্ভাসিত
হয়।তাই একে নুর বলা হয়।

কুরআন মজিন ৩০ টি (ত্রিশটি) ভাগে বিভক্ত।এর প্রতিটি ভাগকে এক একটি পারা বলা
হয়।এর সংখ্যা মােট ১১৪ টি।এগুলাের মধ্যে ৮৬ টি সূরা মাক্কি এবং ২৮ টি সূরা
মাদানি।আল – কুরআনে সর্বমোট ৭ টি মনজিল,৫৪০ টি রূকু ও ১৪ টি সিজদার আয়াত
রয়েছে।এর আয়াত সংখ্যা সর্বমােট ৬২৩৬টি,মতান্তরে ৬৬৬৬।

আল-কুরআনের গুরূত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা

আল-কুরআনের মাধ্যমে আমরা মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ জানতে পারি।কী কাজ
করলে তিনি খুশি হন আর কোন কাজ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন তার জানতে পারি।আল-
কুরআন না থাকলে এগুলাে জানা সম্ভব হতাে না।অতএব বােঝা গেল যে,মানব জীবনে
আল-কুরআনের গুরুত্ব ও প্রয়ােজনীয়তা অপরিসীম।আল-কুরআন মানব জাতির
হিদায়াতের প্রধান প্রধান উৎস।কোন পথে চললে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ
করবে আল-কুরআন তা আমাদের দেখিয়ে দেয়।পাপ-পুণ্য,ন্যায়-অন্যায়,ভালাে-মন্দ
ইত্যাদির পরিচয় দান করে।আল-কুরআনের নির্দেশনামতো চলে আমরা কল্যাণ লাভ
করতে পারি।আখিরাতে আল-কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি
আল-কুরআনের নির্দেশ মেনে চলবে সে হবে মহা সৌভাগ্যশালী।সে পাবে চিরশান্তির
জান্নাত।আর যে কুরআন মজিদের আদেশ নিষেধ মানবে না তার স্থান হবে যন্ত্রণাদায়ক
জাহান্নাম।

তাজবিদ

সহিহ শুদ্ধভাবে কু্রআন পাঠের রীতিকে তাজবিদ বলে ।আল-কুরআন তিলাওয়াতের
ফজিলত লাভের জন্য সহিহ‌ শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে।আর এজন্য
তাজবিদের জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত প্রয়োজন।তাজবিদ অনুযায়ী কুরআন তেলাওয়াত করা
ওয়াজিব।তাজবিদ অনুযায়ী কুরআন পড়া সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন“আপনি ধীরে
ধীরে ও সুস্পষ্টভাবে কুরআন তিলাওয়াত করুন।”(সূরা আল-মুযযাম্মিল,আয়াত ৪)
একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স) বলেন,“ইলমে কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি ঐসব ফেরেশতার
দলভুক্ত,যারা নেককার ও আল্লাহর হুকুমে লেখার কাজে ব্যস্ত।আর যে ব্যক্তি কষ্টকর
হওয়া সত্ত্বেও বারবার চেষ্টা করে কুরআন তিলাওয়াত করে,সে দ্বিগুণ সাওয়াব লাভ
করবে ”(বুখারি ও মুসলিম)।

নুন সাকিন ও তানবিনের বর্ণনা
জমযুক্ত নুনকে নুন সাকিন বলা হয়।অর্থাৎ যে নুনের উপর জযম থাকে তাকে নুন সাকিন
বলে।

তানবিন

দুই যবর, দুই জের ও দুই পেশ কে তানবিন বলে।
নুন সাকিন ও তানবিনের হুকুম ৪টি:
১।ইদগাম
২।ইখফা
৩।ইযহার
৪।ইকলাব
ইদগাম
ইদগাম শব্দের অর্থ মিলিয়ে পড়া,এক জিনিসকে অন্য জিনিসের সাথে মেলানাে।এক
হরফকে অন্য হরফের সাথে মিলিয়ে সন্ধি করে পড়া।তাজবিদের পরিভাষায় নুন সাকিন
বা তানবিনের পর ইদগামের ছয়টি হরফ থেকে কোন একটি হরফ থাকলে নুন সাকিন বা
তানবিনের সাথে ঐ হরফকে সন্ধি করে মিলিয়ে পড়াকে ইদগাম বলা হয়।ইদগামের ফলে
উভয় হরফ একই সময়ে উচ্চারিত হয়।ইদগামের ফলে নুন সাকিন বা তানবিনের পরবর্তী
হরফটি তাশদিদ যুক্ত হয়।
ইদগাম ২প্রকার:
১।গুন্নাহসহ ইদগাম
২। গুন্নাহ ছাড়া ইদগাম
ইখফা
ইখফা অর্থ গােপন করে পড়া।ইখফার হরফ ১৫ টি। নুন সাকিন বা তানবিনের পর ইখফার
হরফ থেকে যেকোনাে একটি হরফ এলে উক্ত নুন সাকিন বা তানবিনকে চন্দ্রবিন্দু উচ্চারণ
করার মতাে নাসিকা সংযােগে গােপন করে এক আলিফ পরিমাণ দীর্ঘ করে পড়াকে
ইখফা বলে।
ইযহার
ইযহার শব্দের অর্থ স্পষ্ট করে পড়া,প্রকাশ করে দেওয়া ইত্যাদি।তাজবিদের পরিভাষায়
নুন সাকিন বা তানবিনের পর ইযহারের কোনাে একটি হৱফ আসলে ঐ নুন সাকিন
তানবিনকে গুন্নাহ না করে স্পষ্টভাবে নিজ মাখরাজ থেকে পড়াকে ইযহার বলে।ইযহারের
হরফ মোট ৬টি।

ইকলাব
ইকলাব অৰ্থ পরিবর্তন করে পড়া।তাজবিদের পরিভাষায় নুন সাকিন বা তানবিনের পর
আরবি বা হরফ আসলে ঐ নুন সাকিন বা তানবিনকে মীম দ্বারা পরিবর্তন করে এক
আলিফ পরিমাণ গুনাহ সহ পড়াকে ইকলাব বলে।ইকলাবের হরফ মাত্র একটি,’বা’।

মীম সাকিনের বর্ণনা
জযমযুক্ত মীম কে মীম সাকিন বলে।অর্থাৎ মীম হরফের উপর জযম থাকলে তাকে মীম
সাকিন বলা হয়।
মীম সাকিন পড়ার নিয়ম তিনটি।
১।ইযহার
২।ইদগাম
২।ইখফা

সূরা আল-কাদর
সূরা আল-কাদর আল-কুরআনের অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন সূরা।এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ
হয়।এর আয়াত সংখ্যা পাঁচটি।সূরা আল-কাদর কুরআন মজিদের ১৭ তম সূরা।এ সূরায়
লাইলাতুল কদর শব্দটি মােট তিনবার এসেছে।এর কদর শব্দ থেকে এ সূরার নাম রাখা
হয় সূরা আল-কাদর।
শানে নুযুল
একদা রাসুলুল্লাহ (স) বনি ইসরাইলের এমন এক একজন লােক সম্পর্কে আলােচনা
করছিলেন,যিনি সমন্ত রাত ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন এবং সারা দিন জিহাদ
করতেন।এভাবে এক হাজার মাস যাবৎ অবিরাম আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মগ্ন
থাকেন।এ বিবরণ শুনে সাহাবিগণ বিস্ময় প্রকাশ করলেন।অতঃপর নিজেদের মধ্যে এ
নিয়ে আফসােস করতে লাগলেন।সাহাবিগণ ভাবলেন-আমরা এক হাজার মাস ইবাদত
করার সুযােগ পাব না।অথচ পূর্ববর্তীগণ বহু বছর বেঁচে থাকতেন।বেশি দিন ইবাদত করার
সুযােগ পেতেন।ফলে আমরা ইবাদতের সাওয়াবে কোনাে দিন তাদের সমান হতে পারব
না। সাহাবিগণের আফসােসের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এ সূরা নাজিল করেন।এতে

তিনি জানিয়ে দেন যে,লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদত হাজার মাস ইবাদত করার
চেয়েও উত্তম।

ব্যখ্যা
লাইলাতুল কাদর বা কাদরের রাত অত্যন্ত মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত রাত।আল্লাহ তায়ালা
এ রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল করেন।এ রাতের ইবাদত হাজার মাস একাধারে ইবাদত
করার চেয়ে উত্তম।এক হাজার মাস ৮৩ বছর ৪ মাসের সমান।এ রাতে আল্লাহ তায়ালা
ফেরেশতাকে রহমত,বরকত ও শান্তির সওগাত দিয়ে প্রেরণ করেন।এ রাতের শুরু থেকে
শেষ পর্যন্ত সুখ-শান্তি ও রহমত বিরাজ করতে থাকে।
শিক্ষা
এ সূরা থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা পাই:
•লাইলাতুল কদর অত্যন্ত মহিমান্বিত রাত।
•এ রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম।
•এ রাতে ফেরেশতাগণ শান্তি ও কল্যাণ নিয়ে দুনিয়ায় নেমে আসেন ।
•এ রাতে সারাক্ষণ শান্তি ও রহমত বর্ষিত হয়।

সুরা আল-যিলযাল
সুরা আল-যিলযাল আল-কুরআনের ৯৯ তম সূরা।এ সূরায় কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা
হয়েছে।সূরার প্রথম আয়াতে উল্লিখিত যিলযাল শব্দ থেকে এর নাম রাখা হয়েছে সূরা
আল-যিলযাল।এটি মদিনা নগরীতে অবতীর্ণ হয়।এর আয়াত সংখ্যা আটটি। শানে নুযুল
একদা জনৈক ব্যক্তি একজন ফকিরকে অতি অল্প পরিমাণ খাদ্য দান করে।অতঃপর সে
বলল যে,এ সামান্য দানে কি সাওয়াব হবে ?
অপর এক ব্যক্তি ছােট ছােট গুনাহ করত।এগুলাে থেকে বিরত থাকত না।বরং সে
এগুলােকে অবহেলা করত।আর এগুলাের কোনাে গুরুত্ব দিত না।

দুই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এ সূরা নাজিল করেন।আর সকলকে জানিয়ে
দেন যে,পুণ্য বা পাপ তা‌যত ছোট‌ই হোক‌ না কেন কিয়ামতে তার জন্য জবাবদিহি করতে
হবে।
ব্যাখ্যা
এ সুরায় কিয়ামত বা মহাপ্রলয়ের বর্ণনা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।মহান
আল্লাহ এক সময় গােটা দুনিয়া ধ্বংস করে দেবেন।তিনি হযরত ইসরাফিল (আ) কে
শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়ার আদেশ দেবেন।হযরত ইসরাফিল (আ) তখন শিঙ্গায় ফুঁক
দেবেন।তাঁর শিঙ্গার শব্দে সারা পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম শৃখলা ভেঙ্গে যাবে।পৃথিবী চরমভাবে
কাঁপতে থাকবে।পৃথিবীর দালানকোঠা,পাহাড়-পর্বত,গাছপালা সমস্ত কিছুই সেদিন ফাংস
হয়ে যাবে।আসমান ভেঙ্গে যাবে।ভূপৃষ্ঠ তার ভেতরের সবকিছু বের করে দেবে।কবরসমূহ
থেকে মানুষ বের হয়ে আসবে।এসব কিছু দেখে মানুষ আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাবে।এরপর
সকল মানুষ হাশরের ময়দানে একত্র হবে।সেখানে তাদের দুনিয়ার কাজকর্মের হিসাব
নেওয়া হবে।ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র কাজকর্মও সেদিন হিসাবের বাইরে থাকবে না।বরং ছােট
পাপ করলেও তার শাস্তি পেতে হবে।অন্যদিকে অণু পরিমাণ পুণ্য করলেও সেদিন মানুষ
তার আমলনামায় দেখতে পাবে।এ পরিমাণ পুণ্যেরও প্রতিদান দেওয়া হবে।
শিক্ষা
এ সূরা থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা পাই:
•কিয়ামতে পৃথিবীর অবস্থা হবে ভয়াবহ।
•মানুষ‌ মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত হবে।
•হাশরের ময়দানে মানুষ নিজ নিজ আমলনামা দেখতে পাবে।
•ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাপ বা পূণ্য কোন কিছুই এ আমলনামায় বাদ পড়বে না।
সূরা আল-ফিল
সূরা আল-ফিল আল-কুরআনের ১০৫ তম সুরা।এটি মক্কা নগরীতে অবতীর্ণ হয়।এর
আয়াত সংখ্যা পাঁচটি।ফিল অর্থ হাতি।এ সূরায় হস্তিবাহিনীর করুণ পরিণতির কথা বর্ণনা
করা হয়েছে বিধায় এ সূরার নাম রাখা হয়েছে সূরা ফিল।
শানে নুযুল

আরবের ইয়ামান প্রদেশের শাসনকর্তার নাম ছিল আবরাহা।সে ছিল খ্রিষ্টান।সে সানআ
নামক স্থানে‌ একটি সুন্দর ও বহু মণিমুক্তা খচিত গির্জা তৈরি করে।অতঃপর মানুষকে তার
গির্জায় উপাসনার জন্য আহ্বান করে।সে চাইল মানুষ যেন মক্কা শরিফে অবস্থিত পবিত্র
কাবাগৃহ ছেড়ে তার গির্জায় উপাসনার জন্য আগমন করে।কিন্তু মানুষ কাবাগৃহকে খুব
সম্মান করত।সুতরাং তারা তার আহ্বানে সাড়া দিল না।তারা আগের মতােই কাবাগৃহে
উপাসনা করতে লাগল।এতে আবরাহা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।সে চিন্তা করল-কাবাগৃহ ধ্বংস না
করলে তার উদ্দেশ্য সফল হবে না।এ জন্য সে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে কাবাগৃহ বংসের জন্য মক্কা
নগরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।সে বহু সৈন্য সংগ্রহ করে এবং ১৩ টি বিশালকায় শক্তিশালী
হাতি নিয়ে অগ্রসর হয়।
আবরাহার আক্রমণের সংবাদ পেয়ে আব্দুল মুত্তালিব কুরাইশদের পাহাড়ে আশ্রয় নিতে
বললেন। আদুল মুত্তালিব ছিলেন রাসুলুল্লাহ (স) এর দাদা ও কুরাইশদের সর্দার।তিনি
জানতেন যে কাবা হলাে আল্লাহর ঘর।সুতরাং এ ঘরের রক্ষার দায়িত্বও আল্লাহরই
উপর।আব্দুল মুত্তালিবের নির্দেশে কুরাইশগণ পাশ্ববর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিল।পরদিন
ভােরে আবরাহা তার বাহিনী নিয়ে কাবা অভিমুখে রওয়ানা হলাে।এমন সময় আল্লাহ
তায়ালা সমুদ্রের দিক থেকে কাকে ঝাঁকে পাখি প্রেরণ করলেন।এলাে‌ছিল একপ্রকার
ছোট ছোট পাখি।এরা দুই পায়ে দুটি ও ঠোঁটে একটি করে‌ কংকর নিয়ে এলো।অত:পর
এগুলাে আবরাহার বাহিনীর উপর নিক্ষেপ করল।ফলে আবরাহার সৈন্য বাহিনী ধ্বংস
হয়ে‌ গেল।আর আবরাহা আহত অবস্থায় পালিয়ে গেল।পরে তার ক্ষতস্থানে পচন ধরে
এবং ভয়ঙ্কর কষ্ঠের পর সে মারা যায়।এভাবে আল্লাহ তায়ালা তার ঘরকে শরুর আক্রমণ
থেকে রক্ষা‌করেন।
হস্তিবাহিনীর ঘটনাটি ৫৭০ সালে সংঘটিত হয়। আমাদের প্রিয়নবি ( স ) এ বছরই
জন্মগ্রহণ করেন।এ অলৌকিক ঘটনা তার জন্মের ৫০ দিন পূর্বে ঘটেছিল।
ব্যাখ্যা
ইয়ামানের বাদশাহ আবরাহা ছিল অনেক ধন-সম্পদ ও সৈন্য-সামন্তের অধিকারী।তার
ছিল বিশাল হস্তিবাহিনী।কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কুদরতের তুলনায় এসব ধন-
সম্পদ,ক্ষমতা কিছুই না।বরং আল্লাহ তায়ালা যা চান তাই হয়।তিনি যাকে যেভাবে ইচ্ছা
লাঞ্ছিত,অপমানিত করতে পারেন।আবরাহা গর্ব ও অহংকারবশত আল্লাহ তায়ালার সাথে
শত্রুতা করে।ফলে সে ধ্বংস হয়ে যায়।আল্লাহ তায়ালা ছােট ছােট পাখির সাহায্যে তার
বিশাল বাহিনী ধ্বংস করে দেন।বস্তুত এটা ছিল আল্লাহর কুদরত মাত্র।আল্লাহর সাথে
শত্রুতা ও বিরােধিতাকারীদের তিনি এভাবেই ধ্বংস করে থাকেন।

শিক্ষা
এ সূরা থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা পাই:
•আল্লাহদ্রোহীদের আল্লাহ তায়ালা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেন।
•তিনি তাদের সমস্ত কলাকৌশল ব্যর্থ করে দেন।

সূরা কুরাইশ
সূরা কুরাইশ হলে মক্কি সূৱা।এর আয়াত সংখ্যা চারটি।এটি আল-কুরআনের ১০৬ তম
সূরা।এ সূরায় মক্কা নগরীর কুরাইশদের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্য এর নাম রাখা
হয়েছে সূরা কুরাইশ
শানে নুযুল
কাবা গৃহের রক্ষণাবেক্ষণ ও সেবার দায়িত্ব ছিল‌ কুযাইশ সম্প্রদায়ের উপর।এজন্য
কুরাইশগণ বহু সুযােগ সুবিধা লাভ করত।তাদের নেতৃত্ব মেনে চলতো।তাদের প্রতি
কোনােরূপ অন্যায়-অত্যাচার করার সাহস পেত না।এ সুযােগে তারা সিরিয়া,ইয়ামান
প্রভৃতি দেশে ব্যবসা বাণিজ্য করতো।তাছাড়া হজ উপলক্ষে বিপুল লােকজন মক্কা
নগরীতে আসত,এতে কুরাইশগণ বহু অর্থ-সম্পদ লাভ করত।কুরাইশদের এসব
মানসম্মান ও ধন – সম্পদ ছিল মূলত কাবা গৃহের বদৌলতে।সুতরাং তাদের উচিত ছিল এ
গৃহের প্রভুকে মেনে চলা।অথচ তারা তা করত না।বরং তারা ছিল মুশরিক।তারা মূর্তিপূজা
করত।আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করত না।রিসালাত ও আখিরাতেও তারা বিশ্বাস করত
না।এ জঘন্য ও অনৈতিক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা এ সূরা নাজিল করে
তাদের সতর্ক করে দেন।
ব্যাখ্যা
এ সূরায় কুরাইশদের নানা নিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।অতঃপর এসব
নিয়ামতের পরিবর্তে তাদের কী করা উচিত এ সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা
হয়েছে।মক্কা নগরীতে কাবা গৃহ অবস্থিত। কাবা হলাে আল্লাহর ঘর।এ জন্য আল্লাহ
তায়ালা মক্কার কুরাইশদের ননা সুবিধা প্রদান করেন।তিনি তাদের সম্মান,মর্যাদা ও
নিরাপত্তা দান করেন।ক্ষুধা তৃষ্ণায় খাদ্য,পানীয় দান করেন।সুতরাং তাদের কর্তব্য হলাে
এসব নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।যে ঘরের বদৌলতে তারা এসব লাভ করলাে সে
ঘরের মালিকের ইবাদত করা।কেননা তিনিই তাদের এসব দান করেছেন।

শিক্ষা
এ সূরা থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা পাই:
•আল্লাহ তায়ালা আমাদের খাদ্য-পানীয় ও নিরাপত্তা দান করেন।
•তিনি সকল নিয়ামতের মালিক।
•সকলেরই উচিত তার ইবাদত করা।

সূরা আল-নাসর
সূরা আন-নাসর বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ হয়েছিল।এর আয়াত সংখ্যা তিন।সূরা আন-
নাসর পবিত্র কুরআনের ১১০তম সূরা।এ সূরার নাসর শবৃদ থেকে সূরাটির নাম রাখা
হয়েছে আন-নাসর।
ব্যাখ্যা
হাদিসে বর্ণিত আছে যে,সূরা আন-নাসর কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ সূরা।অর্থাৎ এরপর
কোনাে সম্পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ হয় নি।এ সূরাতে মক্কা বিজয়ের পর মানুষ যে দলে দলে
ইসলাম গ্রহণ করেছেন,তা উল্লেখ করা হয়েছে।ইসলামের এ বিজয়ের ফলে রাসুলুল্লাহ
(স) এর নবুয়তী দায়িত্বের পরিপূর্ণতাও বােঝানাে হয়েছে।তাই বিশিষ্ট সাহাবিগণ এ সূরা
নাজিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (স) এর ওফাত নিকটবর্তী বলে বুঝতে
পেরেছিলেন।মহানবি (স) এর দুনিয়াতে আগমন ও অবস্থান করার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছে
বলে এ সূরায় ইঙ্গিত করা হয়েছে।এ সূরা দ্বারা আরও বােঝানাে হয়েছে যে,কোনাে
ব্যাপারে যখন আল্লাহ সাহায্য করেন তখন অনেক অসাধ্য কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব
হয়।তখন আল্লাহর প্রশংসা করা আবশ্যক।
শিক্ষা
এ সূরা থেকে আমরা নিম্নোক্ত শিক্ষা পাই:
•আমাদের যাবতীয় কাজে আল্লাহর সাহায্য প্রয়ােজন।
•আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সফলতা লাভ করা যায় না।
•কোনাে কাজে সফলতা আসলে আল্লাহর প্রশংসা ও পবিত্রতা ঘােষণা করা উচিত।
•যাবতীয় ত্রুটি,অপরাধ বা পাপকাজের জন্য তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party