একুশের গান

JSC / পদ্য / বাংলা

একুশের গান

কবিতার মূলভাব :

একুশের গান’ কবিতার মূল উদ্দেশ্য বাঙালির আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ব করার পাশাপাশি শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য সব ধরনের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

‘একুশের গান’ কবিতায় ১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনে বাঙালি ছাত্র-জনতার আত্মোৎসর্গের স্মৃতিচারণা করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের রক্তদান কিছুতেই বিস্মৃত হওয়া যায় না। এই কবিতায় অন্যায়ভাবে গুলিবর্ষণকারী তৎকালীন পাকিস্তানি শোষকের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির জাগ্রত প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। শহীদ ভাইদের রক্তের ঋণ শোধ করার জন্য দেশের হাটে-মাঠে, বাঁকে মানুষের সুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। দেশের মানুষের প্রাণের দাবি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে পাকিস্তানিরা অস্বীকার করেছে। তাদের সব অপচেষ্টা বাঙালিরা ব্যর্থ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আর কোনো শক্তি যেন কোনো অপচেষ্টা করতে না পারে, সে জন্য সর্বপ্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে।

লেখক পরিচিতি :

> আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন একজন খ্যাতিমান কথাশিল্পী, গীতিকার, প্রাবন্ধিক এবং কলামিস্ট। তিনি ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

> ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

>পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন।

> তিনি ছিলেন একজন সমাজমনস্ক লেখক। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

>শিশুতোষ গ্রন্থ : ডানপিটে শওকত, আঁধার কুঠির ছেলেটি।

>তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, ইউনেস্কো পুরস্কারসহ বিভিন্ন পদক ও পুরস্কারে ভূষিত হন।

>বর্তমানে তিনি প্রবাস -জীবন অতিবাহিত করছেন।

রচনার উৎস:

‘একুশের গান’ কবিতাটি মূলত প্রথম ছাপা হয় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশের গান ‘ সংকলনে।

কবিতার ব্যাখা :

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।।

>এখানে কবি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বাঙালি ছাত্র-জনতার আত্মোৎসর্গের স্মৃতিচারণ করেছেন।  ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্র দের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। সেদিন অনেক মা তাঁরা ছেলে হারিয়েছিল, বোনেরা তাঁদের ভাইদের হারিয়েছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি যেন আর্তনাদ,চোখের পানি দিয়ে নির্মিত যা কখনও ভুলা যায় না।

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালোবৈশাখীরা

শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,

দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবি

দিন বদলের ক্রান্তি লগনে তবু তোরা পার পাবি?

না, না, না, না, খুন-রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেয়া তার

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

>এই স্তবকটি দ্বারা অন্যায়ভাবে,নির্বিচারে গুলিবর্ষণকারী  তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রতিরোধের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। সকলকে নির্বিশেষে সেদিনের হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাকিস্তানিরা বাংলার ছেলেদের হত্যা করে দাবি রুখে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাঁরা একদিন অন্যায়ের শাস্তি পাবে, আর সাক্ষী হয়ে থাকবে একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে

রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;

পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,

এমন সময় ঝড় এল এক, ঝড় এল ক্ষ্যাপা বুনো।।

সেই আধাঁরের পশুদের মুখ চেনা

>এখানে কবি ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটির বর্ণনা করেছেন। সেদিন শীতের নীল আকাশে চাঁদ উঠেছিল। বাংলার ছাত্রদের প্রতিবাদ দেখে চাঁদ যেন হেসেছিল। রাজপথে  তাঁদের মিছিল যেন নদীর ধারা। হঠাৎ তখনই পাকিস্তানিরা ঘাতকরা পশুদের মত হামলে পড়লো ছাত্রদের উপর। কেড়ে নিল নিষ্পাপ প্রাণগুলো।

তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা

ওরা গুলি ছোড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবিকে রোখে

ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই বাংলার বুকে

ওরা এদেশের নয়,

দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়

ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

>এই স্তবকটি দ্বারা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি করায় পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর চরম ক্ষোভ,ঘৃণা, প্রতিবাদ প্রকাশ পেয়েছে। পাকিস্তানিরা বাংলার ভাষার দাবিকে রুখে দিয়ে এদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারি সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের সাক্ষী।

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি

আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর-নারী

আমার শহিদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে

জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে

দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি

একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

>কবি আজ সকলকে একুশে ফেব্রুয়ারি মত জেগে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছে। কারণ,এখনও বাঙালি পাকিস্তানি শাসকদের কাছে বন্দী। এখনও শহীদেরা অন্যায়ের বিচার পান নি। তাই গোটা বাঙালি জাতিকে প্রতিবাদের মনোবল জাগ্রত করতে হবে। তবেই একুশের ফেব্রুয়ারির চেতনা সার্থক হবে।

বৃন্তি সাহা

শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়     

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party