আমরা ও আমাদের সংস্কৃতি

resize_t3
Pen's Creation

আমরা ও আমাদের সংস্কৃতি

আমরা- মানে বাংলাদেশের নাগরিক যারা আছি তাঁরা বাংলাদেশি। আমৃত্যু আমরা আমাদের সংস্কৃতি তথা বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি পালন করতে পছন্দ করি। কিন্তু এখন এই ২০২০ সালে এসে আসলেই আমরা শুধুই বাংলাদেশি কি না তা নিয়ে সন্দেহ হয় বা আমাদের সংস্কৃতি আদৌ একান্ত ভাবে বাংলাদেশি আছে কিনা তাও নিঃসন্দেহ না।
বাংলাদেশের মানুষ জাতিগত ভাবে বাঙালী আর বাঙালী শংকর জাতি। তাই আমাদের রয়েছে একটা উৎকৃষ্ট মানের আচারে পরিপূর্ণ সংস্কৃতি। আর আমরাও শংকর জাতি হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আচার ও সংস্কৃতির প্রতি একটা আদি টান অনুভব করি। তবে শুধু অনুভব করেই ক্ষান্ত না, তা এখন আমরা নিজেদের মধ্যে পালন করতে আগ্রহী হচ্ছি। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশ ভারতীয় উপমহাদেশের সাথে সংযুক্ত ছিলো আদি কাল হতে তাই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতি ঘেঁষা। আর ভারতীয় সংস্কৃতি ও পৃথিবীর অন্যান্য সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য বেশ প্রকট হওয়ায় আমাদের সংস্কৃতি ও আমরা একটা দোলাচালে পড়ে গিয়েছি। আবার ভারতীয় সংস্কৃতি ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি এক না। হ্যাঁ, খুব কাছাকাছি বলা যায় তবে অভিন্ন নয়।

অনুকরণপ্রিয় বাংলাদেশিরা এখন একটা কঠিন সময় পার করছে; জাতিগত ও সাংস্কৃতিক অনিরাপত্তার দিক দিয়ে।

ওপার বাংলার কথা না বলে এখন শুধু বাংলাদেশি বাঙ্গালীদের কথা বলছি বলে বলবো, বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের নিজেদের মধ্যে তথা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত একটা রক্ষণশীলতা, অভিরুচি, সংস্কৃতি আছে। মানুষ ভেদে হয়তো ভিন্ন তবে মূলে গিয়ে অভিন্ন। এদেশের মানুষের চলনে বলনে পড়নে একধরণের অপ্রকাশ্য ব্যাপার আছে। খুব উগ্র না চলা, সব কথা বলে না ফেলা, স্বল্পবসন না পড়ার একটা ব্যাপার আছে। এটা হয়তো এখনকার যুগের সাথে সামাঞ্জস্য না তবে গূঢ় ভাবে দেখলে এর সাথে নিরাপত্তাহীনতার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের এই ব্যক্তিগত মূল্যবোধটা আমাদেরকে এটা নিরাপত্তা এনে দিয়েছে। তবে কেন বললাম আমাদের বাংলাদেশি স্বত্ত্বা সন্দেহের কবলে? তার কারণ হলো আস্তে আস্তে আমাদের এই ব্যক্তিগত সংস্কৃতি ভেঙে যাচ্ছে। যদিও এই ভাঙ্গনের শুরু একবিংশ শতাব্দীর জন্মলগ্ন থেকে তবে এখন তা প্রবল বেগ ধারণ করেছে। পূর্বের সেই ব্যক্তিগত মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় হাঁটছি আমরা। চলন-বলন-পড়নের যে রক্ষণশীলতা যে নিরাপত্তাটুকু ছিলো তা আমরা মানছি না। আমাদের এখন আর এইধারার মূল্যবোধ পছন্দ হচ্ছে না।

এবার আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে বললে বাংলাদেশি সংস্কৃতি উপমহাদেশীয় ঘেঁষা হলেও কিছুটা বেশি রক্ষণশীল এবং স্বকীয়তাপূর্ণ। এটিও ব্যক্তিগত সংস্কৃতির মত আস্তে আস্তে ধুয়ে যাচ্ছে। কোনো দেশের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন বা পরিমার্জন একটা আসতে পারে ঠিক তবে তা সম্পূর্ণ বিপরীত হলে চিন্তার বিষয়। ছোট ছোট পরিবর্তন এ শতাব্দীর শুরু থেকে হলেও এই সময়ে এসে তা তুঙ্গে।

সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোকে যদি উদাহরণ হিসেবে নিই তাহলে পুরো ব্যপারটা খুব সহজে বোঝা যাবে। অনুষ্ঠানে আগত মানুষের পোশাক থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানের রঙ-ঢঙ, আনুষ্ঠানিকতা, আচার, আতিথিয়তা, সবকিছুতেই বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সহজ করে বলতে গেলে দেশি ভাবটা নেই কিছুতেই। এক্ষেত্রে বলবো বাংলাদেশের মানুষ আদি ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বেশি আগ্রহী এবং তা গত শতাব্দী থেকে হওয়ায় অনুষ্ঠানগুলোতে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য প্রভাবই প্রকট। তবে এখন তার সাথে যুক্ত হয়েছে আরো বিভিন্ন দেশীয় সংস্কৃতি।

এই পরিবর্তন বা উল্টাধারার শুরু কোথায়, কীভাবে, কেনো তা যদি ব্যাখ্যা করতে চাই তাহলে প্রথমেই আমাদের আগাতে হবে আকাশ সংস্কৃতি ধরে এবং শেষ করতে হবে বিশ্বায়ন দিয়ে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটা দেশীয় ভাবে ছিলো। যখন এদেশে আকাশ সংস্কৃতি ব্যপকভাবে আসলো মানে দেশের আঁনাচে কাঁনাচে পৌঁছে গেলো তখন মানুষের বিদেশি সংস্কৃতিটা মনে ধরলো, নতুন সংস্কৃতি পালনের চাহিদা জাগলো। কিন্তু দেশের বাজার তখনো তৈরী না। তৈরী না বলতে যোগানে-মূল্যে সকলের উপযোগী হলো না। উপযোগী হলো এই শতকের শুরুতে। এরপর যখন বিশ্বায়নের ছোঁয়া এদেশে আসলো তখন এদেশের বাজারও তৈরী মানুষও তৈরী। সকলে ততক্ষণে বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি অনাগ্রহী। এই অনাগ্রহের কারণ হলো এই ভিনদেশের প্রতি আগ্রহ শুরু যখনকার কথা তখনো বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ না বরং মধ্যম আয়ের দেশের মাইলফলকের কাছে। ফলে আর্থিক অবস্থার উন্নতি আছে কিন্তু সংস্কৃতি সেই পুরোনো নিম্ন আয়ের দেশের। তখনকার আর্থিক অবস্থা বাংলাদেশী সংস্কৃতির কাছে বেশ বৃহৎ। ফলে মানুষের হাতে অর্থ আছে কিন্তু সংস্কৃতিতে খাটানোর জন্য বেশি। তাই তখন থেকে আমরা ঝুঁকে যাচ্ছি এমন সংস্কৃতিতে যা বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলাতে সক্ষম ও অর্থ খাটানোর উপযোগী।

তবে এইটা মূল কারণ না। মূল কারণ হলো বাংলাদেশীদের তথা আমাদের মানসিকতা। আমরা প্রথমত তো নকল প্রিয়, দ্বিতীয়ত আমরা রক্ষণশীলতা (যা আমাদের মূল সংস্কৃতিতে বিদ্যমান)-কে পরাধীনতা বা নেতিবাচক ভাবে নিলাম। বিদেশের সংস্কৃতিতে আমরা যেটুক প্রকাশ্য ব্যাপার পাই তা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে নেই। ধর্মীয় একটা ব্যাপার আমাদের সংস্কৃতিতে ছিলো যা এখনকার মানুষ পরিহার করতে চাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের যে নিজস্ব সংস্কৃতি যে বাংলাদেশি স্বত্ত্বা তা এখন পড়তি বা হুমকির মুখে।

এমন অবস্থা থেকে এখন হয়তো আর ফেরত যাওয়ার উপায় নেই। বা এখন সবাই ফেরত গেলেও সেই আদি বাংলাদেশি সংস্কৃতিটা ফিরে পাওয়া যাবে না। তবে এখনো যদি সম্মিলিত প্রচেষ্টা করলে কিছু ফল আসতে পারে।

যেমন নতুন করে বৈদেশিক সংস্কৃতি আত্মস্থ না করা, যা আমরা পালন করছি তা থেকে কিছু অবাঞ্ছিত অপসংস্কৃতি বাদ দেওয়া, দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দেশীয় সাংস্কৃতিক পণ্য রাখা, আকাশ সংস্কৃতির প্রচার নিয়ন্ত্রিত করা, দেশীয় যে মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি আছে তার ব্যপক প্রচার চালানো, নতুন প্রজন্মকে বর্তমান সংস্কৃতির সাথে পরিচয় না করিয়ে আদি বাংলাদেশি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে তাদের সামনে আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপন করা এবং এখন যা রয়েছে তাকে পর্যাপ্ত ভেবে পালন করতে থাকলে হয়তো বাংলাদেশের বাংলাদেশি স্বত্ত্বা ও বাংলাদেশি সংস্কৃতির শেষ রক্ষা হতে পারে।


Contributor:

Nahyan Tarannum
Head of Editorials
Department of Management Information Systems
University of Dhaka

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party