অনুভূতি

resize_27 (1)
Pen's Creation

অনুভূতি

সেদিন বিকাল থেকেই মনের ঘরে কালো মেঘের আনাগোনায় কেমন যেনো আনমনা হয়ে ঘুরছিলাম। আসলে শুধু আজকের দিনটাই না, গেলো প্রায় সপ্তাহ দুয়েক ধরে নিজেই যেনো হারিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি নিজেকে, শ্রীজার যাবার পর থেকেই নিজের বেহাল দশার শুরু, দাড়ি-গোফের এতোটাই উচ্ছন্ন বাড় বেড়েছে যে যেই দেখে সে অনায়াসে বুঝে যায় আমার জীবনের বারোটা নয়, পুরো হিস্ট্রি জিয়োগ্রাফি সব গুলিয়ে গিয়েছে।

আমার আর শ্রীজার সম্পর্কটা আসলে যেভাবে শেষ হওয়া দরকার ছিলো সেভাবে সেটা হয়নি। দুম করে যেদিন শ্রীজা এসে বললো যে ,“দেখো রিয়াদ আমাদের আর এই সম্পর্ক নিয়ে সামনে না এগুনোই ভালো” “আমার আর তোমাকে ভালো লাগছে না “ “তাই আমাদের যাত্রার সমাপ্তিটা এখানে হওয়াই দুজনের জন্যই উত্তম হবে”

আমি কিভাবে এই পরিস্থিতিটা মোকাবেলা করবো বুঝতে পারছিলাম না একেবারেই, অনেকদিন সব ছেড়েছুড়ে দেবার ভাবনা ভেবেছি ঠিকই ,কিন্তু কেনো জানি সেসব করতেই পারিনি। এভাবে সব শেষ হবে সেটা আমার কল্পনার ও বাইরে ছিল, ভালো লাগে না তাই ছেড়ে দিবে এ কেমন লজিক!

আর আজকে যখন সেই শ্রীজাকে দেখলাম অন্য কারো সাথে হেঁটে যেতে তখন ওর সাথে হাঁটার দিনগুলো নিয়ে নস্টালজিয়া ফিলিং এরচেয়ে একটা ঈর্ষার দহনে যেনো পুড়ে যাচ্ছিলাম আর সেটা সত্যিই আজকে বেশ ভালো করেই টের পাচ্ছি । রাগে আমার গাঁ যেনো জ্বলে যাচ্ছিল, সাথে সাথেই কল দিলাম অরুনা, দিশা আর সৌরভকে, কেননা বিপদের দিন এদের ছাড়া কাউকেই পাশে পাইনি কখনোই। সব শেয়ার করার পর ওদের কথায় কিছুটা ভালো লাগছিলো আর রাত ভালোই হয়ে যাওয়ায় রুমে ফেরত গেলাম।

রুমে গিয়ে আবার কেনো জানিনা ওইসব মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলো আর “কি” “কেনো” “কিভাবে” এইসবের উত্তরগুলো বারবার খুঁজতে গিয়েও খালি হাতে ফেরত আসতে হচ্ছিল বারবার। মাথার ঝিমঝিমানি না কমায় বালিশে মাথা এলিয়ে একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করছিলাম , ঠিক তখনই ফোনে দুই দুইটা কল এলো এক অপরিচিত নাম্বার থেকে । আমার আবার একটা বদ অভ্যাস হচ্ছে ঘুমের সময়ে কারোর কলই আমি রিসিভ করি না , সেটা শ্রীজার কল হলেও ধরতাম কিনা সন্দেহ। ফোন উল্টো করে মাথার তলার ক্রস আকারে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে আবার পূর্বের ঘুমের অবস্থানে যাচ্ছিলাম।

কিন্তু আজকে আমার ঘুমের ঘ টার দেখাও পাচ্ছিলাম না, তাই ফোনে ঢু মারতে গিয়ে দেখি ৩টা মেসেজ আনসিন করা , কিছুটা খটকা লাগলো কেননা সিম কোম্পানির মেসেজ ছাড়া আমার ফোনে খুব কমই মেসেজ আসতো। মেসেজ খুলেই চক্ষু চড়কগাছ, এ মা এ তো দেখি ওই নাম্বার থেকেই আসা মেসেজ। মেসেজগুলা ছিলো,

“আমি তারিনা, কল দিয়েছিলাম কিছুক্ষন আগে” “আফিয়া আমাকে তোমার নাম্বার দিয়েছে” “কথা বলার ছিল তোমার সাথে, ফ্রি আছো কি?”

মেসেজগুলো পড়ে আমি এতোটাই অবাক ছিলাম যে কে এই আফিয়া, কেনই বা সে আমার নাম্বার কাউকে দিবে সেটাই হারিয়ে খুঁজছি। কিছুটা শান্ত হলাম মিনিট পাঁচেক পরে, এখন সব কিছুই জলের মতো পরিষ্কার আমার সামনে। মাঝে একদিন আফিয়া আমাকে বলেছিলো একটা মেয়ে আছে ওর আত্নীয় যে কিনা আমাকে খুব পছন্দ করে আর অনেকদিন ধরেই নাকি সে আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে , আজকে বোধকরি সে সাহস যোগাতে পেরেছে সামনে থেকে এসে মেসেজ দেয়ার।

সচারচর এমন ঘটনা ঘটতে দেখিনি বিধায় কিভাবে এর মোকাবেলা করবো সেটার কূল কিনারা করতে পারছিলাম না একদমই। মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসলাম একেবারে। সেই সন্ধ্যা থেকে একটাও সিগারেট না টানায় কেমন যেনো লাগছিলো, নব্য সিগারেটসেবীদের জন্য এটা নাকি কমন সিনড্রোম, তাই মানিব্যাগটা সাথে নিয়ে নিচে চলে এলাম সিগারেট কিনতে। মানিব্যাগে টাকা ছিল মাত্র ১৪টা, কি জানি কি ভেবে সিগারেট না কিনে ওই টাকায় কিনে বসলাম এসএমএস প্যাক। চিনি না ,জানি না এমন কারো জন্য কেনো আমি সেদিন এই কাজখানা করেছিলাম আজো সেইটা ভেবে কূলকিনারা করতে পারি না।

তো আবার ফিরে এলাম নিজের ডেরায় আর এসেই দিলাম তার মেসেজের রিপ্লাই। শ্রীজাকে যেদিন প্রপোজ করি তারপর এমন ফিলিংস আমার কোনোদিনই হয়নি, কোনো এক অজানা ভয় কাজ করছিলো মনের অজান্তেই। পাক্কা মিনিট সাতেক পরে অপরপাশ থেকে জবাব এলো, প্রথমদিকে সেই চিরাচরিত ফরমাল আলাপের পসরা নিয়ে এগিয়ে এলো সে, মনের ঘরের এমনই বাজে হাল ছিল যে ওর মেসেজগুলার উত্তর দেয়া দরকার বলেই দিচ্ছিলাম বলে মনে পড়ে । আস্তে আস্তে আলাপের গভীরতা বাড়তে থাকে, দুজন দুজনকে নিয়ে আরো ভালোভাবে জেনে নিচ্ছিলাম, মেয়েটা বেশ ভালোই কথা বলে তাই অনেকদিন পর অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে বেশ ভালোই লাগছিল। সেদিন ভোরবেলা পর্যন্ত টানা কথা চলে মেসেজে। তার সম্পর্কে জেনে ভালোই লাগছিল কিন্তু তারপরও কি যেনো কি একটা মিসিং ছিল আর আমি কিছুতেই সেটা কি তা বুঝতে পারছিলাম না।

এভাবেই শুরু হয়ে গেলো তার আর আমার এক অজানা পথচলা, যার শুরু আমি আশাও করিনি আর সামনে যাক সেটাও মন থেকে মেনে নিতে পারছি না কেননা শ্রীজার চলে যাওয়ার টাটকা ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি আমি। এখন প্রায় প্রতিনিয়তই তার সাথে কথা হয়, এই দুঃসময়ে সে যেনো এক রূপকথার পরী হয়ে আমাদের জীবনে এসে ধরা দিলো যে কিনা আমাকে এখান থেকে সামনে এগুতে আর পথ দেখাতেই এসেছে।
অনেককথা হবার পরেও আমার মনে কিসের জন্য যেনো সেই আগের হাহাকার চলতেই ছিলো, এরমাঝে ওর মেডিক্যালের পরীক্ষা এসে যায় তখন আমাকে অনুযোগের সূরে বলেই ফেলে,

“আমার জন্য দোয়া করবা বুঝলা, এতোদিন হয়ে গেলো একদিনও তোমার গলা শুনলাম না, যেদিন রেজাল্ট দিবে সেদিন আমি যদি চান্স পাই একটু কথা বলিয়ো কেমন?”

আমিও হেসে জবাব দিলাম,”আরেহ আমার গলার স্বর শুনো নাই এটাই ভালো হইসে , শুনলে হয়তো আর জীবনে কানেই শোনার ইচ্ছা থাকতো না আর হ্যাঁ দোয়া অবশ্যই করবো যদিওবা কাজে লাগবে কিনা সন্দেহ”

ওর পরীক্ষার সময় ওর চেয়ে বেশি চিন্তা হতো আমার কেননা আমি ওর স্বপ্ন নিয়ে কিছুটা হলেও জানতাম আর সত্যিই ওর মতো ডেডিকেটেড লোকের চান্স না পাওয়াটা হবে দুঃখজনক। পরীক্ষা ও ওর ভালোই হলো আর ও খুব আশা নিয়ে বসে আছে কবে রেজাল্ট দিবে আর কবে আমরা কথা বলবো সেটা নিয়ে।

কিন্তু ভাগ্যবিধাতা খেলাটা অন্যভাবেই সাজিয়ে রেখেছিলেন। সবকিছু ভুল প্রমাণ করে তারিনার রেজাল্টই আসলো না, পাস-ফেল ,নাম্বার কিছুই আসে নাই। এ নিয়ে তারিনা অনেক আপসেট হয়ে পড়ে আর আমিও হাঁদারামের মতো ওরে ফোন দিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার বদলে মেসেজে শক্ত হতে বলি কিন্তু সেটা ওর জন্য কতটা কঠিন সেটার কিছুটা আঁচ আমিও করতে পারছিলাম।

মাঝে আমার পরীক্ষা আর কিছুকাজে এতোটাই বিজি হয়ে গিয়েছিলাম যে তারুকে দেওয়ার মতো সময়ই পাচ্ছিলাম না, দিনে যখনই কথা হতো ওর দেহের খবর জানতে হয়তোবা পারতাম কিন্তু মনের ভিতর কি বয়ে যাচ্ছে তা যেনো টেরই পাচ্ছিলাম না।

ওর খালি একটা কথাই ছিল, “তুমি ভালো আছো তো রিয়াদ ? জানো আমি না ভালো নেই , আমি জানি না কিভাবে এই ধাক্কা থেকে সামলে উঠবো, আল্লাহ কেনো যে আমাকেই এতো কষ্ট দিচ্ছেন আমি জানি না, তুমি না ঠিক মতো খাবা-ঘুমাবা আর এখন পড়তে থাকো এই মেসেজের রিপ্লাইয়ের দরকার নাই তুমি পড়ো, কেমন?

আমিও কেমন বোকা ছিলাম যে সত্যি সত্যিই আর রিপ্লাই দিতাম না তবে এতোটাও বোকা না যে ভিতরের দুঃখগুলো বুঝতে পারবো না , কিন্তু তেমন কিছুই করার ছিল না, শ্রীজার জন্য প্রথমদিকের সব পড়া বাকী তাই এখন সময় নষ্ট করার সময় হাতে একদমই নেই।

এভাবেই প্রতিদিন একতরফা মেসেজেই আমাদের কথার আদান প্রদান হতে থাকে।

সেদিন পরীক্ষা শেষ করে তারুর নাম্বারে মেসেজ দিতে যাবো তখনই মেসেজ এলো,

“রিয়াদ আমার অপারেশন ৫টা বাজে, আমার জন্য দোয়া করিও কেমন?”

সেদিন দ্বিতীয়বারের মতো আবার সেই অজানা ভয় কাজ করা শুরু করে দিলো সে ভয়টা প্রথমদিন ছিলো ঠিক সেটাই আজকে আরো বিশাল আকার ধারন করে আমাকে এক করাল গ্রাসে গ্রাসিত করতে এমনভাবে এগিয়ে আসছে যে ভেবেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হওয়া শুরু হয়ে গেলো ।

বাচ্চাদের মতো জিজ্ঞাসা করলাম,”কি হয়েছে আর আগে কেনইবা আমাকে জানাও নাই?”

সে খানিকবাদে রিপ্লাই দিলো , “তোমার পরীক্ষা চলছিলো তাই আলাদা চিন্তা আর বাড়াতে চাইনি তোমার”
“বিগতকিছুদিনের অনিয়মের জন্য এপেন্ডিক্সের ব্যথাটা বেড়ে গিয়েছিল তাই আর দেরি না করে বাবা ডাক্তারের এখানে নিয়ে আসলেন, তুমি বেশি চিন্তা করবা না যাও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে রেস্ট নাও আর আমার জন্য দোয়া করবা, কেমন?

আমি জানি না কেনো এই সিরিয়াস সময়েও বলে বসলাম,”গতবার তো দোয়া করে চান্স পাওয়াতে পারলাম না, এইবার তাই আর করবো না”

আমি এই জিনিসটা তেমন গুরুত্বই দেইনি কেননা এইটা একটা মাইনর অপারেশন আর মনে আত্মবিশ্বাস ছিল ওর কিচ্ছু হবে না।

আমার মজাটা ওর কেমন লেগেছে জানিনা, কিন্তু ভালো অবশ্যই লাগে নাই কেননা পরক্ষনেই সে বলে বসল,” জানো কদিন আগেই আমার এক ফ্রেন্ডের বাবা এর এই সিমিলার অপারেশনে মৃত্যু হয় তাই আমার ও খুব ভয় লাগছে, আমি যেনো সুস্থ হই সেই দোয়াই করবা আর আমি যদি আর না মেসেজ দেই ভেবে নিবা তোমার কেমনের মায়ের হয়তো কিছু হয়ে গেছে, আর পারলে না আমার কবর একবার জিয়ারত করে যেয়ো রিয়াদ, কেমন?

আমি ওর মেসেজের ট্রাজিক একটা ফিল পেলেও এখানেও সেই আগের মতো কি যেনো একটা মিসিং মনে হচ্ছে, তবে আমি ওকে বেশ ধমকেই দিই মেসেজে আর বলি এইসব বাজে চিন্তা যেনো মাথা তেও না আনে।

তারু নাছোড়বান্দা মানুষ আর আজকে কেনো জানি ওর কথাগুলোয় একটা ভয়ের আঁচ আমি টের পাচ্ছিলাম। তবুও ওকে যথাসাধ্য বুঝিয়েই যাচ্ছিলাম এইসব কিছু না জাস্ট কিছুক্ষন পরে ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যেতে পারবে, তারু তাও বারবার মরার আলাপ করেই যাচ্ছে তো করেই যাচ্ছে, স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়া মানুষের না পাওয়ার ছাপ ওর মাঝে সুস্পষ্ট।

যাইহোক অনেক বুঝানোর পর তারু এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে কিন্তু তার শর্ত একটাই মরলে তার কবর জিয়ারত আমাকে করতেই হবে, তারুকে বুঝানো দায় হলো তাই আমি রাজি হয়ে গেলাম।

তারুর সাথে এতো কথা হবার পরেও কিসের যেনো একটা শূন্যতা সর্বদা আমি অনুভব করি, সেই শুরুর দিন থেকে আজো সেই অপূর্ণতার খোঁজ আমার পাওয়া হলো না। তাকে কেনো জানি সেই আপন করে নিতে পারছিলাম না, মনের পিঞ্জিরায় কি নামে তাকে ঠায় দিবো সেই ভেবে যেনো অন্যমনষ্ক হয়ে ঘুরছি আর ওইদিকে অপারেশনের চিন্তায় কিছুতেই ঠিক হয়ে বসতে পারছিলাম না। খালি মাথায় তারুর শেষের কথা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছিলো।

রাতের দিকে তারুর ফোনে সাহস জুটিয়ে কল দেই কেননা ইতোমধ্যে ঘন্টা পাঁচেক হয়ে গেছে আর তারু বলেছিলো এর আগেই সে আমাকে জানাবে সব। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসে না, আদতে কলই ঢুকছিল না । চিন্তা না করতে চেয়েও কেনো জানিনা চিন্তামগ্ন হয়ে গেলাম আর তারুর সেই উদ্ভট চিন্তাগুলো আমার মাথাতেও এসে ঝেঁকে বসলো। আফিয়াকে কল দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম সে কিছু জানে কিনা কিন্তু সেও এ বিষয়ে জানে না বলায় আবার বাজে চিন্তা এসে মাথায় বাসা বাঁধল। বারবার কল করার চেষ্টা করেই যাচ্ছিলাম কিন্তু ফলাফল শূন্য । চিন্তার পারদ যেনো আকাশ ছুঁইছুঁই করছে , সম্ভাব্য সবভাবেই চেষ্টা করা হয়ে গেছে কিন্তু তারুর কোনো খবর এখনো নেই । আজকে আবার অনেকদিন পর নিজেকে ভীষণ একা একা লাগা শুরু হলো, আর মাথায় আবার সেই একই চিন্তা কি যেন নেই, কি যেনো নেই!

এভাবেই চরম অনিশ্চয়তায় কাটিয়ে দিলাম দিন দুই, বিকেলের দিকে চারুর নাম্বার থেকে ফোন এলো, দেখে খালি মনে হয়েছে আচ্ছা করে বকুনি দিতে হবে আজকে, আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে খুব মজা পাচ্ছে তাই না!

ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই খালি একটা কথাই শুনতে পাই কেউ একজন কাঁদো কাঁদো গলায় বলছে “ভাইয়া তারু আপা আর নেই, উনি যাবার আগে একটা চিরকুটে আপনার নাম আর নাম্বার লিখে দিয়ে বলেছিলেন যেনো আপার কিছু হলে আপনাকে জানাই, আপনার তো পরীক্ষা চলে তাই আর আগে জানাইনি”

এইকথাগুলো শোনার পরে নিজেকে একদমই ঠিক রাখতে পারিনি, ওপাশের জনকে কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহসটুকুও ছিল না, খালি আচ্ছা বলে ফোনটা কেটে দেই । কিভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবেলা করবো সেটার ইয়ত্তা এই ক্ষুদ্র জীবনচক্রে আমি ঠাউরে উঠতে পারিনি। কি হলো, কেন হলো আর কেনই বা আমার সাথেই হলো অনেকদিন পর আবার সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার শুরু করলাম কিন্তু এবারেও প্রাপ্তির ঝুলিটা খালিই রয়ে গেলো। নিজেকে হারিয়ে খোঁজা মানুষটা আজকে আবার যেন বড্ড একা হয়ে গেলো। মাথা জুড়ে খালি তারুর চিন্তা আর কি যেনো নেই সেই আক্ষেপ মিলে মাথাটা কুড়ে কুড়ে খাওয়া শুরু করে দিলো আর আজকে আমি যেন নীরব দর্শক যে ভুলেও চায় না এই খেলা শেষ হোক।

এইসবের মাঝেও মনে এলো তারুর শেষ আবদার, সেইটা রক্ষার জন্য সাথে সাথেই রওনা দিলাম খুলনার পথে, যখন গিয়ে পৌঁছলাম তার আগেই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ, এখন তারু কেবলই কারো সন্তান,বোন,বন্ধু হিসেবে মনের কোঠায় স্থান পাবে, বাস্তবে আর তার অস্তিত্ব খুঁজেও পাওয়া যাবে না, সে যে আজ অনন্তকালের পথের যাত্রী তার একার পথ একাই তাকে পাড়ি দিতে হবে, হয়তোবা দেখা হতেও পারে অজানা কোন এক প্রান্তরে এই ইহলোকের মায়া ছাড়িয়ে যখন সবাই বহূদূরে চলে যাবো তখন।

কবরের পাশে বসে এইসব ভেবেই চিন্তা করতে করতে কোন এক জগতে হারিয়ে গেছি তার বিন্দুমাত্র ইয়ত্তা নেই। আকাশের পানে এক অপলক দৃষ্টি দিয়ে যখন বিধাতাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলাম আমার এই কি কেনো কিভাবের জবাব চেয়ে, তখন পাশে এসে দাঁড়ায় তারুর ছোট বোন অরু, একটা চিঠি আমার হাতে দিয়ে ও বলে, “জানেন ভাইয়া আপুর অপারেশনের পর যখন জ্ঞান ফিরে তখন ডাক্তার আংকেল বলতেছিলো আপুর নাকি আর সময় বেশি নাই, তখন আপু আমারে এই চিঠিটা দিয়া বলছিলো আপনি এলে যেনো এইটা আপনাকে দেই, এই নেন এইটা পড়ে দেখেন। ”
আমি কাপাকাপা হাতে ওইটা নিয়ে পড়া শুরু করি,


হাসুনির বাপ,
জানো, গেলো কিছুদিন ধরেই আমার শরীরটা ভালো যাচ্ছেনা, খাওয়াদাওয়ায় অনেক অনিয়ম হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সব জেনেও আমার কেনো জানিনা সব ঠিক করতে মন চাইছে না। তোমার সাথে অনেক কথা বলার বাকী আছে কিন্তু তোমার তো পরীক্ষা এর মাঝে কিভাবে আমি সময় নষ্ট করি বলোতো? তাই আর বিরক্ত করি না তোমাকে।

জানো, ডাক্তার আমাকে সেই বকা দিসে আর কেনই বা দিবে না বলো, গেলো দুই সপ্তাহে ১০ কেজি ওজন কমেছে কিন্তু আমার না বাবা মায়ের সামনে যেতেও এখন লজ্জা লাগে, আমি উনাদের স্বপ্ন সত্যি করতে পারলাম না। ডাক্তার না কি জানি বললো বাবা-মা কে তার সম্পূর্নটা আমি বুঝতে না পারলেও এইটা অন্তত বুঝেছি আমার সিরিয়াস কিছু একটা হয়েছে, কিসের জানি বন্ড সিগনেচার নেওয়ার কথাও বলল, আমিও তো এইসব কিছু জানি তাই না!

আমার না কেনো জানি মনে হচ্ছে বেশি সময় আর আমার হাতে নেই, আমি না জানো চাই অনেকটা সময় আমার হবে আর আমি আবার স্বপ্ন দেখবো নিজেকে নিয়ে , পরিবারকে নিয়ে আর তোমাকে নিয়ে। কিন্তু রিয়াদ আমি বোধহয় সেই সময়টা পাবোনা, ডাক্তারের থেকে আসার পর থেকেই মা কেমন যেন মনমরা হয়ে গেছে , আমাকে আর খাওয়ার জন্য বকে না,খালি কান্নায় মুখ মুছে আর দূরে সরে যায়। আমার না এইসব দেখে নিজেরও কান্না পায় খুব কিন্তু চোখের পানিও শুকিয়ে গিয়েছে জানো।

তোমার গলার আওয়াজ শোনার খুব ইচ্ছে হচ্ছে জানো! যদি একটু সময় পাই তাহলে একদিন তোমার হাতধরে সকাল বেলা শিশিরভেজা মাঠে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াবো আর কোনো এক পুকুরপাড়ে বসে অনেকক্ষন আড্ডা দিবো , একদিন একটা পালতোলা নৌকায় দুজন মিলে ঘুরবো কেমন? তুমি সেদিন নীল পাঞ্জাবি পড়বে আর আমি লাল পেড়ে একটা সাদা শাড়ি পড়বো। অনেককিছু করার বাকী কিন্তু সেই সময় কি আমি পাবো রিয়াদ বলো?

তোমাকে ভেবেছিলাম রেজাল্টের দিন মনের সব কথা বলে দিবো কিন্তু ভাগ্য দোষে তো আর তা হলো না। কিন্তু জানো তো রিয়াদ আমি না সত্যিই তোমাকে অনেক অনেক ভালোবেসে ফেলেছি,জানিনা তুমি কি ভাববে কিন্তু আমি যদি সত্যিই আর না ফিরি আমাকে তুমি সবসময় মনে রেখো আর মিসেস রিয়াদ উপাধিটা নিলে কি তুমি খুব রাগ করবে?

আমি না মা কে সেদিন হাসির ছলে এটা বলে কাঁদিয়ে ফেলেছি, তবে দেখো আমার নামের ফলকে তারিনা আহমেদ না তারিনা হাসান ই থাকবে।
“তুমি ভালো থেকো রিয়াদ”

ইতি,
তোমার তারু
তারিনা হাসান


সেই শেষ কবে চোখ থেকে জল গড়িয়ে গাল ঠোঁট ছুঁয়েছিল সেই ইতিহাস মনে নেই, কিন্তু আজকে এই গোধূলি লগ্নে যখন ফলকে সত্যিই তারিনা হাসান দেখলাম সাথে সাথেই দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ার অনুভূতি পেলাম। আজকে সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছি আর পেয়েছি অনুভূতি যেটা খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে ফেললাম নিজের তারুকে , শুরু থেকেই যে নেই নেই এর হাহাকার করছিলাম সেটার উত্তর দিয়ে গেলো আমার থেকে কয়েককোটি আলোকবর্ষ দূরে বসে থাকা একজনে, যে জিনিসের অনুপস্থিতিতে এতো হাহাকার, হতাশা, সেই আশ্চর্যপ্রদীপের দেখা পেয়ে কি আমি আজকে আসলেই সুখী?
আর কি আসবে এ জীবনে “অনুভূতি!”


Contributor:

Zahid Hasan Riad
Department of Finance
Faculty of Business Studies
University of Dhaka

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party