অধ্যায় ৬ঃ সমবায় সমিতি

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা / ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা (১ম পত্র)

অধ্যায় ৬ঃ সমবায় সমিতি

গুরুত্বপূর্ণঃ সমবায় সমিতির ধারণা,বৈশিষ্ট্য, নীতিমালা,গঠন প্রণালী,উপবিধি,সমবায় সমিতির প্রকারভেদ

অধিক গুরুত্বপূর্ণঃ সমবায় সমিতির ধারণা,নীতিমালা,উপবিধি,সমিতির প্রকারভেদ

সমবায় সমিতি

পারস্পরিক অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য সমশ্রেণির সমমা কতিপয় মানুষ সমবায় আইনের আওতায় যে প্রতিষ্ঠান গঠন ও পরিচালনা করে তাকে সমবায় সমিতি বলে।

এটি একটি আইন সৃষ্ট, অনন্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ব্যবসায় সংগঠন। এর বৈশিষ্ট্য নিম্নে দেয়া হলো-

• গঠন প্রকৃতি
• উদ্দেশ্য
• সদস্য সংখ্যা
• সদস্যদের প্রকৃতি
• মূলধন সংগ্রহ
• শেয়ার ক্রয়ের সীমা
• মুনাফা বন্টন
• ব্যবস্থাপনা কমিটি
• সদস্যদের দায়
• সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও পৃষ্ঠপোষকতা

সমবায়ের নীতিমালা

নীতি বা আদর্শ হলো সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত কাজের নির্দেশনা যা মেনে চললে কাজ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায় বা কার্যক্ষেত্রে সাফল্য লাভ সহজ হয়।সুষ্ঠুভাবে এ ব্যবসায় পরিচালনা করতে হলে কিছু নীতি মেনে চলা আবশ্যক হয়,এ সকল নীতি হলো-

১. একতাঃ সকলে মিলে একভাবে,একমনে ও একত্রে চলার দৃঢ় অভিব্যক্তি, প্রবণতা ও অবস্থাকে একতা বলে।এই প্রধান মূলনীতির ওপর সমবায় প্রতিষ্ঠিত।

২.সাম্যঃ সমবায় সমিতি সাম্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত। সাম্য বলতে সংঘবদ্ধ সকলের পারস্পরিক অধিকারে সমতা প্রতিষ্ঠাকে বুঝায়।সমবায়ের সদস্যরা যেমনি হোক না কেনো তারা সমান মর্যাদার অধিকারী,সবাই এক ভোটের অধিকারী।

৩.সহযোগিতাঃ সমবায়ের আরেকটি মূলমন্ত্র হলো ‘দশে মিলে করি কাজ’। একে অন্যকে সহয়তা করা সমবায়ের ধর্ম।

৪.সততাঃ সততা বলতে ন্যায়পরায়ণতা প্রদর্শন এবং সাধুতা বা ধার্মিকতা বজায় রেখে চলাকে বুঝায়।সমবায়ের বিশেষ করে পরিচালকদের মধ্যে সততার গুণ থাকা এর সংহতি ও সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫.আস্থা ও বিশ্বাসঃ সমবায়ে সফলতা অর্জনের জন্য পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস থাকা অপরিহার্য।বিশ্বাস যত দৃঢ় হবে সমবায়ের প্রতি সদস্যদের আগ্রহ,উদ্দীপনাও তত বাড়ে।

৬.গণতন্ত্রঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের মতামত অনুযায়ী প্রতিনিধি নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থাকেই গণতন্ত্র বলে।সমবায় সমিতিকে সবসময়ই গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়।

৭.সঞ্চিতি সংরক্ষণঃ সমবায়ের বিধান অনুযায়ী অর্জিত মুনাফার একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলক সংরক্ষণকে সঞ্চিতি সংরক্ষণ এবং এরূপ নীতিকে সঞ্চিতি সংরক্ষণ নীতি বলে।অর্জিত মুনাফার ১৫% সংরক্ষিত তহবিলে এবং ৩% উন্নয়ন তহবিলে সংরক্ষণ করতে হবে।

৮.নিরপেক্ষতাঃ কোনো ধরণের পক্ষপাতিত্ব না করার নীতিকেই নিরপেক্ষতার নীতি বলে।ধর্ম,বর্ণ,গোত্র বা দলের ঊর্ধ্বে সবার জন্য কল্যাণ ও ভালোবাসা-এ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে সমবায়।

সমবায় সমিতি গঠন প্রণালী

সমবায় একটি আইনসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান, তাই এটি দেশে বিদ্যমান সমবায় আইন দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত হয়।

১. উদ্যোগ গ্রহণ
২. নিবন্ধনের আবেদন
৩. নিবন্ধনপত্র সংগ্রহ
৪. কার্যারম্ভ পর্যায়

সমবায় সমিতির উপবিধি /উপ-আইন

যে দলিলে সমবায় সমিতির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত নিয়ম-নীতি লেখা থাকে তাকে সমিতির উপবিধি বলে।এর উপর ভিত্তি করে সমবায় গঠিত ও পরিচালিত হয় বিধায় একে সমবায় সমিতির গঠনতন্ত্রও বলা হয়।উপবিধিতে বর্ণিত নিয়ম-নীতির বাইরে কোনো কাজ সমবায় করতে পারেনা।

সমবায় সমিতির প্রকারভেদ

(ক)সদস্যদের প্রকৃতি বিচারে

১.উৎপাদক সমবায় সমিতিঃ কতিপয় উৎপাদক নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উৎপাদন ও বিক্রয় কার্যকে অধিকতর ফলপ্রসু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্য কোনো সমবায় গড়ে তুললে তাকে উৎপাদক সমবায় সমিতি বলে। মহাজন,মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গের দৌরাত্ম হ্রাসে কৃষক, মৎসজীবী, মৃৎশিল্পী,দুগ্ধ উৎপাদনকারী মিলে উৎপাদক সমবায় সমিতি গড়ে তোলে।

২.বিক্রেতা সমবায় সমিতিঃএকই এলাকার বা মার্কেটের বিক্রেতারা নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য সংঘবদ্ধ হয়ে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্মিলিত ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে যে সমবায় সমিতি গড়ে তোলে তাকে বিক্রেতা সমবায় সমিতি বলে। হকার্স সমবায় সমিতি, বণিক সমিতি, পুস্তক সমিতি এভাবে মাছ বিক্রেতা,স্বর্ণ বিক্রেতা ইত্যাদি নানান ধরণের বিক্রেতারা নিজেরা মিলে এরূপ সমবায় গড়ে।

৩.মালিক সমবায় সমিতিঃ মালিক শ্রেণির মানুষ নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য নিজেদের সংঘবদ্ধতা সৃষ্টির পাশাপাশি মালিকানা সংশ্লিষ্ট স্বার্থরক্ষায় সমবায় গড়ে তুললে তাকে মালিক সমবায় সমিতি বলে।ফ্লাট মালিক,বাড়ি মালিক,দোকার মালিক,প্রেস মালিক,পরিবহণ মালিক ইত্যাদি।

৪.পেশাজীবী সমবায় সমিতিঃ একই পেশার মানুষ নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উদ্দেশ্য সমবায় সমিতি গঠন করলে তাকে পেশাজীবী সমবায় সমিতি বলে।প্রকৌশলী, ডিপ্লোমা প্রকৌশলী, কৃষিবিদ,হিসাব নিরীক্ষক,চিকিৎসক ইত্যাদি এ সমবায়ের অংশ।

৫.শ্রমজীবী মানুষদের সমবায় সমিতিঃবিভিন্ন ধরনের শ্রমজীবী মানুষ তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সমিতি প্রতিষ্ঠা করলে তাকে শ্রমজীবী মানুষদের সমবায় সমিতি বলে।শ্রমজীবী সমবায় সমিতি, ঘাট শ্রমিক সমিতি, নির্মাণ শ্রমিক সমিতি -এভাবে কর্মচারী,শ্রমিক,টেম্পু চালক, ভ্যান চালক ইত্যাদি শ্রেনির মানুষদের এ ধরনের সমবায় সমিতি গড়ে তুলতে দেখা যায়।

৬.ভোক্তা সমবায় সমিতিঃ ভোক্রাগণ ক্রয় সুবিধা প্রাপ্তির লক্ষ্যে নিজেদের প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় কোনো সমবায় সমিতি গঠনপূর্বক সমবায় বিপণি স্থাপন ও পরিচলনা করলে তাকে ভোক্তা সমবায় সমিতি বলে।শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানের গেটে,বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদেএ উদ্যোগে,বড় হাউজিং কমপ্লেক্সের গেটে এর মালিকদের উদ্যোগে এ ধরনের সমবায় বিপণি গড়ে তোলা হয়।

৭.বিশেষ শ্রেণির মানুষদের সমবায় সমিতিঃ পেশাজীবী,কর্মজীবী,উৎপাদকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বাইরেও সমাজের বিশেষ শ্রেনির অনেক মানুষ নিজেদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করলে তাকে বিশেষ শ্রেনির মানুষদের সমবায় সমিতি বলে।আমাদের সমাজে ভূমিহীন সমবায় সমিতি, বিত্তহীন, মহিলা,মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি নিয়ে এ সমিতি গঠন করা যায়।

(খ)উদ্দেশ্যগত দিক বিচারে

১.ক্রয় সমবায় সমিতিঃ শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বা উপকরণাদি একই সাথে সংগ্রহের মাধ্যমে ক্রয় সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে একই ধরণের কমবিত্তসম্পন্ন উৎপাদকগণ সমবায় সমিতি স্থাপন করলে তাকে ক্রয় সমবায় সমিতি বলে।

২.বিক্রয় সমবায় সমিতিঃ কোনো এলাকায় একই ধরনের ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীগণ বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অধিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে সমবায় সমিতি স্থাপন করলে তাকে বিক্রয় সমবায় সমিতি বলে।উৎপাদক সমিতি এর উদাহরণ।

৩.ঋণদান সমবায় সমিতিঃ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উৎপাদক, কৃষিজীবী বা স্বল্প আয়ের বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিগণ প্রয়োজনীয় সময়ে ঋণ সুবিধা লাভের জন্য কোনো সমবায় সমিতি গড়ে তুলতে তাকে ঋণদান সমবায় সমিতি বলে।

৪.উন্নয়ন সমবায় সমিতিঃ সদস্যদের কোনো একটি বৈষয়িক উন্নয়ন লাভের উদ্দেশ্য সমবায় সমিতি গঠন করা হলে তাকে উন্নয়ন সমবায় সমিতি বলে।

৫.গৃহনির্মাণ সমবায় সমিতিঃ সমিতির সদস্যদের আবাসিক সমস্যা সমাধানকল্পে যে সমবায় সমিতি গঠন করা হয় তাই গৃহনির্মাণ সমবায় সমিতি। নগরকেন্দ্রিক মানুষের যে চরম আবাসিক সংকট লক্ষ করা যায় তা দূর করার জন্যই এ ধরনের সমবায় গঠন করা হয়েছে।

৬.সমবায় আবাসিক এলাকাঃ সদস্যরা মিলে সমবায়ের ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা গড়ে তুললে তাকে সমবায় আবাসিক এলাকা বলে।

৭.সমবায় ব্যাংকঃ অনেকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমবায় ঋণদান সমিতি একত্রিত হয়ে নিজেদের আর্থিক প্রয়োজন মিটানোর জন্য কোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে তাকে সমবায় ব্যাংক বলে।

৮.বহুমুখী সমবায় সমিতিঃ একাধিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কোনো সমবায় সমিতি গঠিত হলে তাকে বহুমুখী সমবায় সমিতি বলে।

(গ) সংগঠনিক দিক থেকে

১.প্রাথমিক সমবায় সমিতিঃ ন্যূনতম ২০জন একক ব্যক্তি এবং যাহার উদ্দেশ্য হবে বৈধ উপায়ে সমিতির আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন,এধরণের সমিতিকে প্রাথমিক সমবায় সমিতি বলে।

২. কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতিঃ অন্তত ১০টি প্রাথমিক সমবায় সমিতি এবং উদ্দেশ্য হবে উক্ত সদস্য সমিতিগুলোর কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহয়তা করা এবং সমন্বয় সাধন, এরূপ সমবায়কে কেন্দ্রীয় সমবায় বলে।

৩. জাতীয় সমবায় সমিতিঃ ১০টি কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি নিয়ে,দেশব্যাপী উক্ত সদস্য সমিতিগুলোর কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় সহয়তা করে তাকে জাতীয় সমবায় সমিতি বলে।

বাংলাদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নে সমবায় সমিতির অবদান

১.ঐক্য ও সচেতনতা সৃষ্টি
২.কর্মস্পৃহা সৃষ্টি ও আশাবাদ জাগ্রতকরণ
৩.বৃহদায়তন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা
৪.সঞ্চয়ের অভ্যাস সৃষ্টি ও মূলধন গঠন
৫.মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম হ্রাস
৭.বেকার সমস্যা সমাধান
৮.দারিদ্র‍্য দূরীকরণ

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party