অধ্যায় ৩ঃপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা / ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা (২য় পত্র)

অধ্যায় ৩ঃপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ

গুরুত্বপূর্ণঃ পরিকল্পনার ধারণা, পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য, উত্তম বা আদর্শ পরিকল্পনার গুণ বা বৈশিষ্ট্য, পরিকল্পনার লক্ষ্য,পরিকল্পনা প্রণয়নের ধাপ বা বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরিকল্পনার প্রকারভেদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারণা,সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।

অধিক গুরুত্বপূর্ণঃ পরিকল্পনার ধারণা, উত্তম বা আদর্শ পরিকল্পনার গুণ বা বৈশিষ্ট্য,পরিকল্পনা প্রণয়নের ধাপ বা বিভিন্ন পদক্ষেপ, পরিকল্পনার প্রকারভেদ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারণা,সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া।

পরিকল্পনার ধারণা

ভবিষ্যতে কি করা হবে তা আগাম ঠিক করে ফেলাই হলো পরিকল্পনা।
ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ার সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো পণ্য উৎপাদনের জন্য কি কি কাঁচামাল দরকার,কোথা থেকে আনা হবে,কি পরিমাণ আনা হবে, কর্মী সংখ্যা কেমন প্রয়োজন হবে-এইসকল পরিকল্পনা আগেই করে পণ্য উৎপাদন করতে হবে। পরিকল্পনা ছাড়া সকল কাজেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

পরিকল্পনার বৈশিষ্ট্য

পরিকল্পনা হলো ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের পূর্বনির্ধারিত প্রতিচ্ছবি।ব্যবস্থাপনা কার্যের প্রথম ও প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যা ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্য হতে একে স্বতন্ত্র রূপ প্রদান করেছে।নিম্নে এর বৈশিষ্ট্যসমূহ দেয়া হলো-

১.পরিকল্পনার প্রাথমিকতা ও মূখ্যতাঃ পরিকল্পনা হলো ব্যবস্থাপনাত প্রথম ও মৌলিক কাজ। কী করা হবে শুধুমাত্র এতটুকু ঠিক করাই পরিকল্পনা নয়। বরং কখন,কার দ্বারা,কত সময়,কোন কাজ করানো হবে ইত্যাদি বিষয়ও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।

২.চিন্তন-মনন প্রক্রিয়াঃ পরিকল্পনা বিষয়টি চিন্তার সাথে সম্পৃক্ত। কোনো পরিকল্পনার জন্য তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, তা নিয়ে চিন্তা করতে হয় এজন্য বলা হয়,পরিকল্পনা হলো কাজ শুরুর পূর্বে চিন্তা-ভাবনার প্রক্রিয়া।

৩.ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে অনুমানঃ পরিকল্পনা সবসময়ই ভবিষ্যৎ অনুমানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ বা পরিকল্পনা অঙ্গন কেমন থাকবে এবং গৃহীত পরিকল্পনা সে সকল পরিবেশের মধ্য দিয়ে কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তাও অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। অর্থাৎ, সঠিক পূর্বানুমান ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা দূর করতে সহায়তা করে।

৪.পরিকল্পনার উদ্দেশ্যমুখিতাঃ পরিকল্পনা সবসময়ই একটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যকে সামনে রেখে হয়। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে উদ্দেশ্য মোট কাঁচামালের পরিমাণ, মোট শ্রমঘন্টার অপচয় হ্রাস,প্রয়োজনে নতুন শ্রমিক নিয়োগ ইত্যাদি সকল বিষয়ে অতিরিক্ত পরিকল্পনা নেয়ার প্রয়োজন পড়ে।

৫.পরিকল্পনার তথ্য নির্ভরশীলতাঃ অতীতকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তা করা যায় না,তাই পরিকল্পনা প্রণয়নে সব সময়ই অতীতে কী ঘটেছে তার মূল্যায়ন করতে হয়। এজন্য বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও তা বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা যায়।
প্রয়োজনে বিভিন্ন পক্ষের নিকট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করতে হয়।

৬.উত্তম বিকল্পঃ বিকল্পসমূহের মধ্য থেকে বাস্তবতা বিবেচনায় সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বিকল্পটিকেই উত্তম বিকল্প বলে। উদ্দেশ্যার্জনে একাধিক বিকল্প পন্থা অনুসরণ করা যেতে পারে। বিকল্পসমূহের মধ্য থেকে সবদিক বিচারে উত্তম বিকল্প গ্রহণই পরিকল্পনা হিসেবে গৃহীত।

উত্তম পরিকল্পনার গুণ বা বৈশিষ্ট্য

১.সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যঃ কাঙ্ক্ষিত ফল যাকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাকেই প্রতিষ্ঠানের বা কাজের উদ্দেশ্য বলে।পরিকল্পনা প্রণয়নে এর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য প্রথমেই নির্ধারিত হওয়া আবশ্যক।উদ্দেশ্যবিহীন পরিকল্পনা কখনই কার্যকর ফল দিতে পারেনা। তাই একটি আদর্শ পরিকল্পনা অবশ্যই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যকেন্দ্রিক হওয়া উচিত।

২.বাস্তবমুখিতাঃ বাস্তবমুখিতা বলতে ভবিষ্যৎ অবস্থা বিবেচনায় পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য হওয়াকে বুঝায়। বৃহত্তর উদ্দেশ্য এবং তার আলোকে একটি বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করলেই তা সুফল দিতে পারেনা। অবাস্তব পরিকল্পনা সবার মাঝে তাৎক্ষণিক কিছুটা আশাবাদ সৃষ্টি করতে সমর্থ হলেও কার্যক্ষেত্রে তা কখনই কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়না।

৩.গ্রহণযোগ্যতা/পালনযোগ্যতাঃ পরিকল্পনা যারা বাস্তবায়ন করবে তারা পরিকল্পনাকে সাদরে গ্রহণ করাকেই পরিকল্পনার গ্রহণযোগ্যতা বলে। যদি পরিকল্পনাকে কর্মীরা কোনো কারণে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ না করতে পারে তবে তার সঠিক বাস্তবায়ন আশা করা যায় না।

৪.সঠিক পথ-নির্দেশনাঃ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্তকরণীয় বিষয়ে পরিকল্পনা থেকে যেন নির্দেশনা পাওয়ার সম্ভব হয় এটা নিশ্চিত করাকেই পরিকল্পনার সঠিক পথনির্দেশনা বলে। প্রতিষ্ঠানে যদি কাপড় উৎপাদন করার পরিকল্পনা করা হয় তবে কি কি প্রয়োজন, তা কর্মীরা আগেই বুঝতে পারে, তারা পরিকল্পনা থেকেই সঠিক পথ বুঝতে পেরেছে।

৫.সমন্বয় ও যোগসূত্রঃ বিভিন্ন পর্যায়ে গৃহীত পরিকল্পনাকে মূল লক্ষ্যের আলোকে একসূত্রে সংযুক্ত করার কাজই হলো পরিকল্পনায় সমন্বয় ও যোগসূত্র স্থাপন।প্রতিষ্ঠানের মূল পরিকল্পনায় পূর্ব সময়ে গৃহীত পরিকল্পনার সাথে এবং বিভিন্ন স্তরে গৃহীত পরিকল্পনা মূল পরিকল্পনার সাথে সমন্বিত হওয়া আবশ্যক। বিক্রয় বিভাগ ও উৎপাদন বিভাগের পরিকল্পনায় যোগসূত্রিতা না থাকলে উভয় পরিকল্পনায় যে অকার্যকর-তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

৬.নমনীয়তাঃ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতি বিধানের সামর্থ্যকে নমনীয়তা বলে। পরিকল্পনা মাফিক সব আবস্থা একই থাকবে এমনটা আশা করা যায় না।তাই অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে যতটা সম্ভব দ্রুততার সাথে পরিকল্পনা সংশোধন করতে হয়।তাই পরিকল্পনা করার সময়ই বিকল্প পথা চিন্তা করে রাখা উত্তম।

পরিকল্পনার লক্ষ্য

পরিকল্পনার অভিপ্রেত ফলকে লক্ষ্য বলে।এটি একটি সাধারণ পরিভাষা। পরিকল্পনার ভিন্নতা থাকায় লক্ষ্যকেও নানানভাবে অভিধায় নামকরণ করতে দেয়া যায়। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় বিষয়টিকে নিম্নে আলোচনা করা হলো-

(ক) প্রকৃতি বিচারেঃ

১.উদ্দেশ্যঃ উদ্দেশ্য হলো অভিপ্রেত লক্ষ্য যাকে ঘিরে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়।যেমনঃ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পিছনে ব্যবসায়ীর উদ্দেশ থাকে মুনাফা অর্জন,অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের থাকে কল্যাণসাধনের উদ্দেশ্য ইত্যাদি।

২.মিশনঃ মিশন লক্ষ্যের আরেকটি রূপ। একটা শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উন্নত পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রয়াসকে মিশন হিসেবে দেখা যায়।

৩.সময় লক্ষ্যঃ একটা কাজ কত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে এটা নির্ধারণকেই সময় লক্ষ্য বলে। অনেক সময় এরূপ লক্ষ্য সকল কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্যবিন্দু বিবেচিত হয়।

৪.বাজেট লক্ষ্যঃ প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশিত ফলাফল যখন সংখ্যায় প্রকাশ করা হয় তাকে বাজেট লক্ষ্য বলে। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বিগত বছরের তুলনায় ২৫% বৃদ্ধির লক্ষ্যকে বাজেট লক্ষ্য বলে।

(খ) সাংগঠনিক স্তর বিচারেঃ

১.স্ট্যাটিজিক লক্ষ্যঃ প্রতিষ্ঠানের ঊধ্বর্তন নির্বাহীগণ প্রতিষ্ঠানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন তাকে স্ট্যাটিজিক লক্ষ্য বলে। দশ বছরের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের মুনাফাত হার ২০%, একটি স্ট্যাটিজিক লক্ষ্যের উদাহরণ।

২.বিভাগীয় বা কৌশলগত লক্ষ্যঃ প্রতিষ্ঠানের মধ্য পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ স্ট্যাটিজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেন তাকে বিভাগীয় বা কৌশলগত লক্ষ্য বলে। বিক্রয় বৃদ্ধির স্ট্যাটিজিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একটা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বিভাগ এক বছরে ২৫% উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

৩.কার্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্যঃ প্রতিষ্ঠানের নিচের পর্যায়ের উপবিভাগ বা কর্মকেন্দ্রগুলোতে বিভাগীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যে সকল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তাকে কার্যসম্বন্ধীয় লক্ষ্য বলে। যে কোনো মেশিনে ত্রুটি দেখা দেয়ার ৩ঘন্টার মধ্যে অবশ্যই তা মেরামত করতে হবে ইত্যাদি।

পরিকল্পনা প্রণয়নের ধাপ

▪ভবিষ্যৎ মূল্যায়নঃ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও দুর্বলতা এবং বাহ্যিক সুযোগ ও বাধা চিন্তায় নিয়ে ভবিষ্যৎ অবস্থা কেমন হতে পারে তার আগাম মূল্যায়নকে পরিকল্পনা প্রণয়নে ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন বলে।

▪লক্ষ্য নির্ধারণঃ পরিকল্পনা গ্রহণের পূর্বে কোন ফল অর্জনের জন্য তা প্রণীত হবে পূর্বেই তা নির্ধারণকে পরিকল্পনার লক্ষ্য নির্ধারণ বলে। একটা প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন বিগত বছরের তুলনায় ১০%ভাগ বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তার আলোকে বিভিন্ন বিভাগের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এ সকল লক্ষ্য অবশ্যই সুস্পষ্ট এবং সমন্বিত হওয়া উচিত।

▪বিকল্প স্থিরকরণঃ অনুমিত অবস্থার মধ্যে দিয়ে কিভাবে লক্ষ্যে পোঁছানো যাবে এ জন্য বিভিন্ন বিকল্প কার্যপদ্ধতি দাঁড় করানোর কাজকেই পরিকল্পনায় বিকল্প স্থিরকরণ বলে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কিভাবে নিজেদের পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি করা যায়,যেমন- মূল্য কমানো,বিজ্ঞাপন বাড়ানো পণ্যের মান বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্ন বিকল্প স্থিরকরণ।

▪বিকল্পসমূহ মূল্যায়নঃ দাঁড় করানো প্রতিটি বিকল্প তার সুবিধা-অসুবিধার আলোকে কতটা গ্রহণযোগ্য তা বিবেচনা করার কাজকেই বিকল্পসমূহ মূল্যায়ন বলে। প্রয়োজনে প্রতিটি বিকল্পকে একেকটি প্রজেক্ট হিসেবে বিবেচনা করে তাতে সম্ভাব্য ব্যয়,প্রাপ্তব্য সুবিধা ও অসুবিধা পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হয়।

▪সর্বোত্তম বিকল্প গ্রহণঃ বিকল্পসমূহের মূল্যায়নের পর প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতার আলোকে কার্যকর বিকল্পটি খুঁজে বের করাকেই সর্বোত্তম বিকল্প গ্রহণ বলে।বিজ্ঞাপন না বাড়িয়ে মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের কমিশনের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি লাভজনক বিবেচিত হতে পারে।

▪সহায়ক পরিকল্পনা প্রণয়নঃ মৌলিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কোনো সহায়ক বা সহযোগী ভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলে তাকে সহায়ক পরিকল্পনা প্রণয়ন বলে। যেমন, একটা বিমান কোম্পানি কয়েকটা নতুন বিমান ক্রয়ের পরিকল্পনা নিচ্ছে,এখন এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কতকগুলো সহায়ক পরিকল্পনা নিতে হবে- ক্রু সংগ্রহ,তাদের প্রশিক্ষণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা ইত্যাদি।

পরিকল্পনার প্রকারভেদ

পরিকল্পনার ব্যাপ্তি সকল স্তর পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পরিকল্পনাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। নিম্নে দেখানো হলো-

(ক) প্রকৃতিগত শ্রেণিবিভাগ

১.লক্ষ্যঃ পরিকল্পনার অভিপ্রেত ফলকে লক্ষ্য বলে। এরূপ অভিপ্রেত ফল বা লক্ষ্যার্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল উপায়-উপাদান ও কর্মপ্রচেষ্টাকে কাজে লাগানো হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ১০% উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা এরূপ লক্ষ্যের একটি উদাহরণ।

২.স্থায়ী পরিকল্পনাঃ যে পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানে একবার গৃহীত হওয়ার পর নতুন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ বা নতুন কোনো অবস্থা সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তা বারবার ব্যবহৃত হয় তাকে স্থায়ী পরিকল্পনা বলে।

এরূপ পরিকল্পনা নিম্নোক্ত কয়েক ধরনের হতে পারে-

▪নীতিঃ একই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বনির্ধারিত আদর্শ বা সাধারণ নির্দেশনাকেই নীতি বলে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নগদ বিক্রয়ের নিয়ম বা জ্যেষ্ঠত্বের ভিত্তিতে পদোন্নতি প্রদান -এরূপ নীতির উদাহরণ।

▪প্রক্রিয়াঃ লক্ষ্যার্জনে পরস্পর নির্ভরশীল ধারাবাহিক কার্যসমষ্টিকে প্রক্রিয়া বলে। একটি কাজের সাথে অন্য কাজ সর্বদা সম্পর্কিত থাকে। কর্মী নির্বাচনের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ হতে শুরু করে নিয়োগ দান পর্যন্ত কর্মসমষ্টিকে প্রক্রিয়া বলে।

▪পদ্ধতিঃ প্রক্রিয়ার অধীন্র নির্ধারিত প্রত্যেকটি কার্য সম্পাদনের জন্য গৃহীত কার্যক্রমকে পদ্ধতি বলে। কর্মী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় লিখিত পরীক্ষা নেয়া একটি অন্যতম পদ্ধতি বা উপায়।এই লিখিত পরীক্ষা কিভাবে নেয়া হবে এ সম্পর্কিত নিয়মকে পদ্ধতি বলে।

▪কৌশলঃ কৌশল হলো এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরিকল্পনা। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের থেকে কিভাবে বেশি মুনাফা অর্জন করা যাবে সেটিই কৌশল। উৎপাদিত দ্রব্য সরাসরি ভোক্তাদের নিকট সরবরাহের নীতি -কৌশলের উদাহরণ।


৩.একার্থক পরিকল্পনাঃ যে পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানে শুধুমাত্র একবার ব্যবহারের জন্য বা একটি মাত্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রণয়ন করা হয় তাকে একার্থক পরিকল্পনা বলে।


এ ধরণের পরিকল্পনাকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়-
▪ কর্মসূচিঃ কোনো বিশেষ লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে বড় ধরনের পরিকল্পনা গৃহীত হয় তাকে কর্মসূচি বলে।বাংলাদেশের খাবার পানিতে আর্সেনিক দূষণ রোধ করার জন্য গৃহীত বড় ধরনের পরিকল্পনা এর উদাহরণ। পোলিও রোগ নিরূপনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনা, প্রতিষ্ঠানের পুরনো সকল যন্ত্রপাতি সরিয়ে নতুন যন্ত্রপাতি বসানোর পরিকল্পনাকে কর্মসূচি বলে।

▪প্রকল্পঃ কর্মসূচির আওতায় বিশেষ কার্য সম্পাদনের প্রতিটি পরিকল্পনাকে প্রকল্প বলে। আর্সেনিক দূষণ রোধে অনেকগুলো পরিকল্পনার সাথে দূষণযুক্ত টিউবওয়েল শনাক্তকরণের পরিকল্পনাকে একটা প্রকল্প হিসেবে গণ্য করা যায়।


(খ) মেয়াদভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ

১.স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাঃ সাধারণত এক বৎসর বা তার কম সময়ের জন্য গৃহীত পরিকল্পনাকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বলে। প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় ও উপবিভাগীয় পর্যায়ে যে সকল পরিকল্পনা গৃহীত হয় তা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার উদাহরণ।

২.মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনাঃ এক বৎসরের অধিক ও সর্বোচ্চ পাঁচ বৎসর সময়ের জন্য গৃহীত পরিকল্পনাকে মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা বলে। সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এর একটি উদাহরণ।

৩.দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাঃ পাঁচ বৎসরের অধিক যেকোনো সময়ের জন্য এ ধরনের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সরকারের VISION 2021 এর ঘোষণা এর অন্তর্ভুক্ত।

(গ) সংগঠন কাঠামোভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ

১.স্ট্র‍্যাটিজিক বা কৌশলগত পরিকল্পনাঃ তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তমূলক কোনো পরিকল্পনা গ্রহণকে স্ট্র‍্যাটিজিক পরিকল্পনা বলে। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পণ্যসারিতে নতুন ১০টি আইটেম অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এটি স্ট্র‍্যাটিজিক পরিকল্পনার উদাহরণ।

২.কার্যভিত্তিক পরিকল্পনাঃ প্রতিষ্ঠানের স্ট্র‍্যাটিজিক বা কৌশলমূলক পরিকল্পনার আলোকে প্রতিষ্ঠানের মধ্য ও নিম্ন পর্যায়ে স্বল্প সময়ের জন্য বাস্তবায়নমূলক যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তাকে কার্যভিত্তিক পরিকল্পনা বলে।

ক.বিভাগীয় পরিকল্পনাঃ প্রতিষ্ঠানের পৃথক পৃথক বিভাগের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে তাকে বিভাগীয় পরিকল্পনা বলে।
খ.আঞ্চলিক পরিকল্পনাঃ যে সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত থাকে সেক্ষেত্রে আঞ্চলিকভাবেও পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়।
৩.মাস্টার বা সামগ্রিক পরিকল্পনাঃ কোনো প্রতিষ্ঠানের সকল বিভাগ বা অঞ্চলের পরিকল্পনাকে একত্রিত করে যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় তাকে সামগ্রিক পরিকল্পনা বলে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারণা

যে কোনো সমস্যা সমাধান বা কর্মপন্থা গ্রহণে একাধিক উপায় বা বিকল্প থেকে সর্বোত্তম বিকল্প বাছাইকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ বলে।
একজনের ক্ষুধা পেয়েছে,এখন সে কি খাবে তা তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে,যা খেলে ক্ষুধা নিবারণ ও শক্তি পাওয়া যাবে সেই উপযুক্ত খাবার নির্বাচন করতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হয়,উক্ত সিদ্ধান্ত যদি যথোপযুক্ত না হয় তবে ব্যর্থতা অনিবার্য।

সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীকে অবশ্যই অনেক বিষয় ভাবতে হয় এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে কতকগুলো ধারাবাহিক পদক্ষেপ বিবেচনার বা প্রক্রিয়ার অনুসরণের প্রয়োজন পড়ে। এগুলো হলো-

১.সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সংজ্ঞায়িতকরণঃ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিবে, সকল সমস্যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হয়না, তাই সমস্যা সংজ্ঞায়িতকরে তা চিহ্নিত করতে হবে।

২.অগ্রাধিকার নির্ধারণঃ সমস্যার পরিমাণ একাধিক হলে এবং সবগুলো একসাথে সমাধান সম্ভব না হলে কোনটি আগে এবং কোনটি পরে করা হবে এ বিষয় নির্ধারণকেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ বলে। যেমন-
নতুন মেশিন প্রয়োজন, বিল্ডিং সম্প্রসারণের কাজ চলছে এবং উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল প্রয়োজন -এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। দেখতে হবে কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ তেমন ভাবেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

৩.তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহঃ কোনো বিষয়ে প্রকৃত অবস্থা,জ্ঞান,বিষয় বা সংবাদকে তথ্য বলে। সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যত বেশি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সমর্থ হন তত বেশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। এরূপ তথ্য সংগ্রহ চিহ্নিত সমস্যা বা করনীয় বুঝতে যেমনি সহায়তা করে তেমনি সমস্যা সমাধানের বিভিন্ন উপায় অনুসন্ধানেও সহায়তা দেয়।

৪.বিকল্পসমূহ উদ্ভাবনঃ অনুমিত অবস্থার আলোকে সমস্যা সমাধানে সম্ভাব্য উপায়সমূহ দাঁড় করানোর কাজকেই বিকল্প উদ্ভাবন বলে। ধরা যাক,একটা মেশিন পুনঃস্থাপন করতে হবে। মেশিনের দাম ও প্রতিষ্ঠান কি পরিমাণ টাকা ব্যয় করতে পারবে – এই দু’য়ের মধ্যে বিশ্লেষণ করে বিকল্পগুলোর মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় একটি তালিকা করতে হবে।

৫.বিকল্পসমূহ মূল্যায়নঃ দাঁড় করানো প্রতিটি বিকল্প উপায় সুবিধা- অসুবিধার আলোকে কতটা গ্রহণযোগ্য তা বিবেচনা করার কাজকেই বিকল্পসমূহ মূল্যায়ন বলে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য ও সম্ভাবনা,দুর্বলতা ও ঝুঁকির দিকগুলো বিবেচনা করতে হয়।

৬.উত্তম বিকল্প গ্রহণঃ মূল্যায়নকৃত বিকল্প হতে প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা বিবেচনায় উত্তম বিকল্প বাছাইয়ের কাজকেই উত্তম বিকল্প গ্রহণ বলে।

Neshat Tasnim

Executive of SILSWA

Tourism and Hospitality Management

University of Dhaka


Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party