অধ্যায় ১২ঃ ব্যবসায়ে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা / ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা (১ম পত্র)

অধ্যায় ১২ঃ ব্যবসায়ে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

গুরুত্বপূর্ণঃ ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণা , ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা , সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা ও গুরুত্ব , ব্যবসায় সামাজিক দায়িত্ব পালন , ব্যবসায়িক কারণে পরিবেশ দূষণের প্রভাব , পরিবেশ সংরক্ষণে বণিক সমিতির দায়িত্ব , সামাজিক দায়বদ্ধতা অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গৃহীত কার্যক্রম ।

অধিকগুরুত্বপূর্ণঃব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণা , ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা , সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা ও গুরুত্ব , ব্যবসায় সামাজিক দায়িত্ব পালন , পরিবেশ সংরক্ষণে বণিক সমিতির দায়িত্ব , সামাজিক দায়বদ্ধতা অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গৃহীত কার্যক্রম।

ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ধারণা

ব্যবসায়িক মূল্যবোধ হলো ব্যবসায় পরিচালনায় কোনটি ভালো , কোনটি মন্দ , কোনটি উচিত কোনটি অনুচিত – এ সংক্রান্ত মানুষের বোধ বা উপলব্ধি ।

ব্যবসায় নৈতিকতা হলো ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে উচিত অনুচিত মেনে চলা বা ভালকে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করে চলাই ।

ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা

ব্যবসায় কতটা নীতি নৈতিকতা মেনে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর সমাজের মানুষগুলোর নৈতিকতার মান , জনগণের মন-মানসিকতা , সামাজিক সুস্থতা , স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইত্যাদি নানান বিষয় নির্ভর করে ।যে কারণে ব্যবসায়িক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সমাজে অনেক বেশি প্রয়োজন ।

নিম্নে এর কতিপয় কারণ তুলে ধরা হলো –

১.ব্যক্তির পরিশুদ্ধি অর্জনঃ বিশ্বাস ও আচরণে মানুষ পরিশীলিত হবে এটাই সৃষ্টিকর্তার প্রত্যাশা । প্রতিটি মানুষ ও অন্যের নিকট থেকে এটাই প্রত্যাশা করে ।মানুষের বিবেকবোধ ও তাকে সদা ভালো হয়ে চলার মন্ত্রণা দেয় ।তাই একজন ব্যবসায়ী যখন মূল্যবোধ ও নৈতিকতা মেনে ব্যবসায় করে তখন তার মধ্যে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নির্মল মানসিক সন্তুষ্টি অর্জিত হয় ।

২.স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সুরক্ষাঃ ফরমালিনযুক্ত মাছ ও ফলমূল , অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত শাক – সবজি , খাদ্যে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মিশ্রণ ইত্যাদি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভয়ংকার তা সবারই জানা ।তার ব্যবসায়ী পারে এইসব মুক্ত পণ্য ভোক্তাদের সরবরাহ করতে ।

৩.উত্তম পরিবেশ সুরক্ষাঃ উত্তম পরিবেশ মানুষকে বিকশিত করে ।কিন্তু সমগ্র বিশ্বে পরিবেশ দূষণে মুখ্য ভূমিকা রাখছে শিল্প কারখানা গুলো । এই সকল ব্যবসায়ীদের নৈতিকতার শিক্ষাই তাদের পরিবেশ আইনের অনুসরণে ও উত্তম সুরক্ষায় কার্যকর সহযোগিতা দিতে পারে ।

৪.মানসিক প্রশান্তি প্রতিষ্ঠাঃ পণ্য সামগ্রী স্বাস্থ্যকর হলে ভোক্তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন ।এ সকল পণ্য ভেজালমুক্ত ব্যবসায়ীরাই সরবরাহ করতে পারেন , এতে ভোক্তাদের মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকবে ।

৫.সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাঃ সমাজে অনেক ব্যবসায়ী যখন অন্যায় কাজ করে তখন সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিই মানুষের বিরূপ ধারণার সৃষ্টি হয় ।অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা নৈতিকতা মেনে চললে গ্রাহকেরা ব্যবসায়ীদের উপরনির্ভর করতে পারবে ।এতে সমাজে একটা সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে ।

৬.জাতীয় ভাব মর্যাদা প্রতিষ্ঠাঃ ব্যবসায়ীরা দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ।ব্যবসায়ী যদি খারাপ হয় তবে বিদেশী ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতারণা করে তবে দেশের ভাবমূর্তি প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ।

ব্যবসায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা ও গুরুত্ব

সমাজ থেকে প্রাপ্ত নানান সুবিধা ও সহযোগিতার বিপক্ষে সমাজ ও সমাজ সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের প্রতি ব্যবসায়ের কর্তব্য পালনের দায়কে ব্যবসায়ের সামাজিক দায়বদ্ধতা বলে ।

নিচে সামাজিক দায়বদ্ধতার গুরুত্ব সংক্ষেপে দেয়া হলো
১.
সামাজিক বিপর্যয় রোধ
২.
সহযোগিতার উন্নয়ন
৩.
ব্যবসায়ের সুনাম প্রতিষ্ঠা

ব্যবসায়ের সামাজিক দায়িত্ব পালন

বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় জগতে ভালো করতে হলে ব্যবসায়ীদেরকে অবশ্যই সমাজের বিভিন্ন পক্ষের প্রতি দায়িত্ব পালনের প্রয়োজন পড়ে ।সামাজিক দায়িত্বসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো –

১. ক্রেতা ও ভোক্তাদের প্রতি দায়িত্বঃ

পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং ন্যায্যমূল্যে উন্নতমানের পণ্য সরবরাহ করা ;
– চাহিদা মতো পণ্য অল্প আয়াসে ও সহজ শর্তে নিশ্চিত করা ;
– নতুন পণ্য উৎপাদন বা সংগ্রহ করে ক্রেতাদের সর্বোচ্চ তৃপ্তি দানের ব্যবস্থা করা ।

২.শ্রমিক কর্মচারীদের প্রতি দায়িত্বঃ

উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও আর্থিক সুবিধা দান;
– চাকরির নিরাপত্তা বিধান ও ভবিষ্যৎ আর্থিক নিশ্চয়তা ব্যবস্থা করা ;
– শ্রমিক -কর্মচারীদের সাথে ভালো আচরণ করা ;
– বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা ।

৩. বিনিয়োগকারী ও সরবরাহকারীদের প্রতি দায়িত্বঃ

– পাওনাদারদের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ করা ;
– শেয়ারহোল্ডারদের ন্যায্য ও উৎসাহ ব্যঞ্জক লভ্যাংশ প্রদানের চেষ্টা চালানো ;
– ব্যবসায় উন্নয়ন , সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগকারীদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ।

৪.সরকারের প্রতি দায়িত্বঃ

– সরকারের যথারীতি কর ও রাজস্ব প্রদান করা ;
– সরকারি নিয়ম – নীতি যথাযথ অনুসরণ করা ;
– সরকারকে বিভিন্ন বিষয় পরামর্শ প্রদান ও সহযোগিতা দেয়া ;
– বেকার সমস্যা সমাধানে সরকারকে সহায়তা করা ।

৫. সগোত্রীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি দায়িত্বঃ-

– প্রতিবেশি ব্যবসায়ীদের সংঘবদ্ধ করে সংঘ বা সমিতি গড়ে তোলা;
– একের অসুবিধায় অন্যের সহযোগিতা করা;
– অন্যায় প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়া ।

৬.সাধারণ সম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্বঃ

– সমাজের প্রয়োজন মাফিক পণ্য ও সেবা সামগ্রী উৎপাদন ও তা সরবরাহ করা ;
– বিভিন্ন জনহিতকর কাজে সহায়তা দান ও জাতীয় দুর্যোগ মুহূর্তে জনগণের পাশে দাড়ানো ;
– এলাকায় হাসপাতাল , শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , ধর্মীয় ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গঠন
– প্রতিবেশীদের জন্য বিদ্যুৎ , গ্যাস সংযোগ, রাস্তাঘাট সুবিধা – প্রদান ইত্যাদি।

ব্যবসায়িক কারণে পরিবেশ দূষণের প্রভাব

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় দায় হলো ব্যবসায়ী সমাজের ।তারা জেনেও বিভিন্ন ধরনের দূষণের সাথে লিপ্ত হয়ে গিয়েছে । হাটে – বাজারে উচ্চ শব্দের মাইক , মানুষের হট্টগোল , কোলাহল , পানিতে বর্জ্য , তৈল , ময়লাসহ নানান আবর্জনা ফেলা হচ্ছে ।মাটিতে কৃষিজমির সার , ইটের ভাটার ইটের টুকরা মাটিতে মিশে যাচ্ছে , যা মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করছে । শিল্পকারখানার ধুয়া , ধুলা -বালি , পরিবহনের পোড়া ডিজেল থেকে নির্গত সিসা ইত্যাদি প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ করে যাচ্ছে ।

পরিবেশ সংরক্ষণে বণিক সমিতির দায়িত্ব

বণিক সভা হচ্ছে বণিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় দেখাশুনার জন্য তাদের গড়া স্বেচ্ছা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান । এসকল সভা ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব করে ।তাই ব্যবসায়ের সামাজিক দায়বোধের বিষয়টি তাদের দায়বোধের ও বিষয় ।
বিভিন্ন বণিক সমিতির পরিবেশ দূষণ রোধে নিম্নোক্ত উপায়ে সহযোগিতা করতে পারেঃ

১. আইনানুযায়ী যেসকল শিল্পে বর্জ্য শোধন যন্ত্রপাতি (ETP) বসানো প্রয়োজন তা সমিতির সকল সদস্য যাতে মান্য করে তা নিশ্চিত করা ;

২. কোনো শিল্প ইউনিট এই নিয়মভঙ্গ করলে সমিতির সদস্য পদ বাতিলসহ সমিতির পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ;

৩. ট্যানারি শিল্প দ্রুত ঢাকার মধ্যে থেকে চামড়া শিল্প পার্কে সরাতে সরকারকে সর্বোত সহযোগিতা প্রদান ;

৪.বিক্ষিপ্তভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান না গড়তে সদস্যদের উদ্ভুদ্ধ করা ;

৫.ইটের ভাটা গুলি যেনো সরকারি নিয়ম মেনে চিমনি ব্যবহার ও ইটভাটা স্থাপন করে এবং কাঠ পুড়িয়ে বন উজাড় করতে না পারে সেজন্য সমিতির পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থান গ্রহণ;

সামাজিক দায়বদ্ধতা অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের গৃহীত কার্যক্রম

◾ ব্যাংকিং খাত

কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে । শিক্ষা , স্বাস্থ্য , পুষ্টি সরবরাহ , খেলাধুলা , দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা , নারীউন্নয়ন , বিধবা নারীদের ভাতা প্রদান বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ দেশের ব্যাংক গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে । CSR এর আওতায় ২০০৯ সালে ব্যাংকগুলো যখন ৫৫ কোটি টাকা খরচ করেছে তখন ২০১২ সালে এ কার্যক্রম ব্যয়িত হয়েছে ৩০৪.৬৭ কোটি টাকা ।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে ডাচবাংলা ব্যাংক সবচেয়ে এগিয়ে ।

◾গ্রামীণফোন

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মোবাইলফোন অপারেটর কোম্পানি গ্রামীণফোন CSR এর আওতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে মিলে সমাজের মানুষদের জন্য কাজ করে চলেছে ।জনসচেতনতা সৃষ্টি , সরকারের টীকা দান কর্মসূচিতে সহায়তা দান , টেলিচর্ম চিকিৎসা সহায়তা প্রদান , বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ সেবা ইত্যাদি সমাজ সেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি CSR এর ক্ষেত্রে এগিয়ে ।২০০৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সাথে মিলে শিশুদের পোলিও খাওয়ানোর ও টীকা দানের কর্মসূচিতে কাজ করে যাচ্ছে ।

◾আকিজগ্রুপ

বাংলাদেশের স্বনামধন্য উদ্যোক্তা মরহুম আকিজউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত আকিজগ্রুপ বাংলাদেশের একটা অন্যতম শিল্পগ্রুপ হিসেবে পরিচিত ।২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ টির বেশি সমাজ সেবামূলক কাজের সাথে আকিজগ্রুপ জড়িত আছে । তাদের প্রতিষ্ঠিত কিছু ফাউন্ডেশন হচ্ছে , আদ – দ্বীন উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ , ঢাকায় ফাতেমা নার্সিং ইন্সটিটিউট , কুষ্টিয়ায় সফিনা নার্সিং ইন্সটিটিউট , ঢাকায় আদ – দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল , যশোরে আদ-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইত্যাদি ।
এছাড়াও স্কুল ফাউন্ডেশন , এতিমখানা , বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান রয়েছে ।

◾গেটস ফাউন্ডেশন /বিলএন্ড মেলিন্দা গেটস ফাউন্ডেশন

১৯৯৪সালে প্রতিষ্ঠিত গেটস ফাউন্ডেশন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত প্রাইভেট ফাউন্ডেশন ।
প্রতিষ্ঠানটি ৩টি প্রধান খাত হলো-
১.
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি
২.
বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি
৩.
যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কর্মসূচি

Neshat Tasnim

Executive of SILSWA

Tourism and Hospitality Management

University of Dhaka

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party