অধ্যায় ১:ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম।

JSC / বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অধ্যায় ১:ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম।

আলোচ্য বিষয়সমূহ: ঔপনিবেশিক শাসন ও উপনিবেশ, ঔপনিবেশিক শাসনের পটভূমি, বাংলায় ইউরোপীদের আগমন ও বানিজ্য বিস্তার, ঔপনিবেশিক শক্তি বিজয়ের কারণ, ইংরেজ শাসন ও শাসনের অবসান, বাংলার নবজাগরণ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব।

ঔপনিবেশিক শাসন ও উপনিবেশ:

ঔপনিবেশিক শাসন: এক দেশের মানুষ অন্য কোনো দেশের উপর নিজের শাসন বা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাকে ঔপনিবেশিক শাসন বলে।

উপনিবেশ: একটি দেশের মানুষ অন্য কোনো দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করলে অধীনস্থ দেশটিকে আধিপত্যকারী দেশের উপনিবেশ বলে।

ঔপনিবেশিক যুগ: যে যুগে একটি দেশ অন্য একটি দেশের শাসনাধীনে থাকে সে যুগকে ঔপনিবেশিক যুগ বলে।

বাংলায় ইউরোপীয়দের আগমন ও ঔপনিবেশিক শাসনের পটভূমি:

ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই প্রথম বাংলায় আগমন করেন। বাংলায় ইউরোপীয়দের পাঁচটি শক্তির আগমন হয় সেগুলো হলো :

১. পর্তুগিজ: ইউরোপের দেশ পর্তুগালের অধিবাসীদের পর্তুগিজ বলা হয়। বাংলাদেশে পর্তুগিজরা ফিরিঙ্গি নামে পরিচিত ছিল।

২. ইংরেজ বা ব্রিটিশ: ইউরোপের দেশ ব্রিটেন বা ইংল্যান্ডের অধিবাসীদের ইংরেজ বা ব্রিটিশ বলা হয়।

৩. ওলন্দাজ বা ডাচ: ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদের ওলন্দাজ বা ডাচ বলা হয়।

৪. দিনেমার বা ডেনিশ:ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের অধিবাসীদের দিনেমার বা ডেনিশ বলা হয়।

৫. ফরাসি: ইউরোপের দেশ ফ্রান্সের অধিবাসীদের ফরাসি বলা হয়।সূচনালগ্ন থেকে বাংলায় বহিরাগত শক্তির প্রবেশ ছিল এবং বিভিন্ন বহিরাগত শাসক গোষ্ঠী বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করে। যেসকল বহিরাগতরা বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন:

১. সেন বংশ:

  • দক্ষিন ভারতের কর্নাটক হতে আগত।
  • বহিরাগত মুলসমান শক্তি অর্থাৎ তুর্কিদের হাতে শাসনের অবসান।

২. ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি:

  • একজন তুর্কি সেনাপতি।
  • সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে বাংলা দখল করে।
  • মৃত্যু ১২০৬ সালে

৩. ফখরউদ্দীন মোবারক শাহ:

  • সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন

৪. আফগান:

৫. মোগল শাসন:

  • ১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি পুর্ব বাংলার জমিদার বারোভুঁইয়াদের পরাজিত করে বাংলায় অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

৬.ইংরেজ শাসন:

  • পলাশির যুদ্ধে মোগল সম্রাট নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মোগল শাসনের অবসান হয় এবং বাংলা দখল করে ইংরেজরা।
  • ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯০ তথা প্রায় দুইশো বছর শাসন করে।

৭. পাকিস্তান:

  • ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসনের অবসানের পর জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তান নামক দুইটি রাষ্ট্রের। বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের অংশ ছিল।
  • ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে শাসন করে পাকিস্তান।
  • ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে পাকিস্তান শাসনামল জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।

অবিভক্ত বাংলা:

বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ ও ভারতের কয়েকটি রাজ্যের সমন্বয় ছিল অবিভক্ত বাংলা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার শাসন ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ১৯০৫ সালে ইংরেজরা অবিভক্ত বাংলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে,যে ঘটনাকে বঙ্গভঙ্গও বলা হয়। একারণে বাংলার ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গের পূর্বে ভারত নামটির সম্পর্কও লক্ষ করা যায়।

বাংলায় ইউরোপীয়দের বানিজ্য বিস্তার:

ইউরোপে বানিজ্য বিস্তারের যুগে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো যখন বহির্বিশ্বের ছড়িয়ে পড়ে তখন তাদের আকর্ষন ছিল ভারতবর্ষে। মূলত বানিজ্যের উদ্দেশ্যে ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে আসেন। ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে আসেন। বিভিন্ন স্থানে বানিজ্য কুঠি স্থাপন করে তারা ভারতবর্ষে একচেটিয়া বানিজ্য বিস্তার করে। একচেটিয়া ও নিপীড়নমুলক বানিজ্যের জন্য মোগল সম্রাটের নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় জনগণের বিরোধিতার কারনে ভারতবর্ষে তাদের বানিজ্য আস্তে আস্তে বিলীন হতে থাকে। এরপর ১৬০০ সালে “ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে আসেন ইংরেজরা। বিভিন্ন স্থানে বানিজ্য কুঠি স্থাপন, কারখানা প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে বানিজ্য বিস্তার করতে থাকে ইংরেজরা। এরমধ্যে “ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” প্রতিষ্ঠা করে ভারতবর্ষে বানিজ্য করতে আসে ওলন্দাজ বা ডাচরা। তারাও বিভিন্ন স্থানে বানিজ্য কুঠি স্থাপন করে কিন্তু ইংরেজ কোম্পানির সাথে টিকে থাকতে না পেরে তারা কিছুকাল পরে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার দিকে চলে যায়। ইংরেজরা ভারতবর্ষে আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বানিজ্য বিস্তার করতে থাকে। তারপর আসে দিনেমাররা কিন্তু তারাও ইংরেজদের সাথে টিকে থাকতে না পেরে চলে যায়। এরপর ১৬৬৪ সালে “ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” প্রতিষ্ঠা করে ফরাসিরা ভারতবর্ষে বানিজ্য করতে আসে। “চন্দননগর ও চুঁচুড়ায়” ফরাসিরা বানিজ্য কুঠি স্থাপন করলেও ইংরেজদের সাথে তিন দফায় যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ফরাসিরা ও তাদের বানিজ্য গুটিয়ে ইন্দোচীনের দিকে চলে যায়। এরপর ইংরেজরা আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারতবর্ষে বানিজ্য বিস্তার করেন। এভাবেই বাংলায় ইউরোপীয়দের বানিজ্য বিস্তার ঘটে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি:

ভারতবর্ষে বানিজ্য করার জন্য ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডে যে জয়েন স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় সেটাই হলো ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের ব্রিটেনের অর্থনীতির একটি বড় অংশ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আয়।

বাংলায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়ের কারণ:

বাংলায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয়ের বিভিন্ন কারন ছিল। তারমধ্যে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় একটি।বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের কারন:

  • দীর্ঘদিন বহিরাগত শাসকদের অর্থনৈতিক শোষণ ও নির্যাতন:যার ফলে সাধারণ মানুষরা শাসকদের প্রতি উদাসীন ছিল অর্থাৎ কে শাসন করছে কে করছে না তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। তাই একের পর এক ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল
  • পুজি পাচার: দীর্ঘকাল পুজি পাচারের ফলে সাধারণ মানুষের অনেক শোষন বঞ্চনা সহ্য করতে হয় এবং দারিদ্র্যতার কারনে শাসন কে করছে তা নিয়ে তাদের কোনো উদ্দীপনা বা চিন্তা চেতনা ছিলনা। তাই একের পর এক ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
  • উদীয়মান ইংরেজ শক্তি বৃদ্ধি: ইংরেজরা তাদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে যাকে। তাদের এই চাতুর্যতা ও শঠ পরিকল্পনা বোঝার মত কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তি এই দেশে ছিল না, যারা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
  • বাংলার শাসকদের মধ্যে কোন্দল ও চক্রান্ত: বাংলার শাসকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ষড়যন্ত্রের কারনে বাংলার শাসকরা নিজেরা কখনো এক হতে পারেনি। তাদের চক্রান্ত নবাব বুঝতে ও পারেনি ফলস্বরূপ কালক্রমে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পলাশির যুদ্ধ :

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী পলাশি নামক স্থানে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় সেটাই পলাশির যুদ্ধ।পলাশির যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও ইংরেজদের জয় হয়। নবাবের পরাজয়ের পেছনে বিভিন্ন কারন ছিল। আপন খালা ঘসেটি বেগমের ষড়যন্ত্র, নিজ সেনাপতি সিপাহশালার মীরজাফর সহ মীর কাশিম, উমিচাঁদ, জগৎ শেঠ, রাজ বল্লভ এর বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র, ইংরেজদের শক্তি মোকাবিলা এবং ক্ষমতালোভী ভারতীয় বনিক শ্রেণীর বিরোধিতা মোকাবিলা করা তরুন নবাবের পক্ষে সম্ভব হয়নি। ফলস্বরূপ পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও নির্মম মৃত্যু হয়।

ইংরেজ শাসন:

ইংরেজ বা ব্রিটিশরা ভারতবর্ষকে দুইভাবে শাসন করে-

  • ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন : সংক্ষেপে সেটাকে কোম্পানি শাসন বলে।ইংরেজরা ভারতবর্ষে প্রথমে কোম্পানি শাসনকার্য পরিচালনা করে।
  • ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসন : কোম্পানি শাসনের অবসানের পর ইংল্যান্ড রাজশক্তির হাতে চলে যায় ভারতবর্ষের শাসনভার।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন:

বানিজ্য বিস্তারের মধ্যদিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আকার ও প্রভাব বাড়তে থাকে। শুরুতে মোগল সাম্রাজ্যে বা ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল শুধুমাত্র বানিজ্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভারতবর্ষে অন্যান্য ইউরোপীয়দের আগমনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিযোগীর সূচিত হয়। যেকারনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাঝে একটা ভীতির সৃষ্টি হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আয় ছিল তখন ব্রিটেনের অর্থনীতির বড় একটি অংশ। সেসময় অন্যান্য ইউরোপীয় প্রতিযোগীর আগমনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিধি কমে যাওয়ার একটা শঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু ইংরেজরা অন্যান্য ইউরোপীয়দের সেখানে টিকতে না দিলেও তারা চেয়েছিলো ভারতবর্ষে বানিজ্যের জন্য আর কেউ না আসুক। তাই তারা ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় ও প্রভাব খাটানো শুরু করে। আর এই প্রভাব খাটানোর রেশ ধরেই বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংঘটিত হয় পলাশির যুদ্ধ।

যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও মৃত্যুর পর বিশ্বাসঘাতকার পুরষ্কার স্বরূপ ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাবের সিংহাসনে বসায়। অন্যদিকে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ তৎকালীন ত্রিশ লক্ষ টাকা লাভ করে ইংল্যান্ড চলে যায়। মীর জাফরের শাসনামলে ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা ও ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু হয়। কোম্পানির দাবিকৃত বিপুল অর্থের যোগান দিতে ব্যর্থ হলে ১৭৬০ সালে ইংরেজরা মীর জাফরকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাশিমকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বসায়। কিন্তু স্বাধীনচেতা ব্যক্তি মীর কাশিমের স্বাধীনভাবে বাংলাকে শাসন করার ইচ্ছার কারনে ইংরেজদের সাথে মীর কাশিমের দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং ১৭৬৩ সালে মীর কাশিমকে ক্ষমতাচ্যুত করে আবার মীর জাফর কে নবারের সিংহাসনে বসানো হয়। ১৭৬৫ সালে মীর জাফরের মৃত্যুর পর মীর জাফরের দ্বিতীয় পুত্র নাজিম উদ্দীন আলী খান বাংলার নবাবের সিংহাসনে বসেন। এইদিকে একই বছর অর্থাৎ ১৭৬৫ সালে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ আবার ভারতবর্ষে ফিরে আসেন এবং ইংরেজ সরকারের গভর্নর নিযুক্ত হন। গভর্নর নিযুক্ত হয়ে লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দিল্লির মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজ্য শাসনের জন্য পদ লাভ করে। এরপর লর্ড ক্লাইভ দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার কারনে বাংলার নবাবের থাকে নামমাত্র অস্তিত্ব। অন্যদিকে মোগলদের শক্তি কমে যাওয়ায় দিল্লির দুরবর্তী রাজ্যগুলোতে কেন্দ্রের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইংরেজরা ভারতবর্ষের শাসনব্যবস্থায় তাদের প্রভাব জোরদার করতে থাকে। এভাবেই ভারতবর্ষে কোম্পানির শাসন শুরু হয়। কোম্পানি শাসনামলে ইংরেজরা এদেশ থেকে পুঁজি ও প্রচুর ধন সম্পদ পাচার করে।

দ্বৈতশাসন:

শাসন ও বিচার বিভাগের দায়িত্ব নবাবের হাতে এবং রাজস্ব, কর আদায় ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয় কোম্পানির হাতে। একেই দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বলে।পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজ গভর্নর লর্ড ক্লাইভ ১৭৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজ্য শাসনের জন্য পদ লাভ করে। লর্ড ক্লাইভ তখন দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। যে ব্যবস্থার কারনে বাংলার নবাবরা হয়ে পড়েন ক্ষমতাহীন, নবাবের থাকে শুধু নামমাত্র অস্তিত্ব।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতন:

কোম্পানির কর্মচারীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থের লালসা, অতিরিক্ত করারোপ, শোষণ ও নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারনে জনগণের মধ্যে নাভিশ্বাস দেখা দেয়। কোম্পানি শাসনের প্রতি জনগণের অসন্তোষের কারনে ১৮৫৭ সালে “সিপাহি বিদ্রোহ ” সংঘটিত হয়। বিদ্রোহে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের স্বাধীনচেতা শাসকরা ও যোগ দেয়। কোম্পানি সেই বিদ্রোহ কঠোর হস্তে দমন করে এবং সিপাহি বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। কিন্তু এই ঘটনার পর ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের শাসনের অবসান ঘটায়। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে “ভারত শাসন আইন” পাসের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের শাসন ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে চলে যায়। সেই সময় ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নেয়। এভাবে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে দীর্ঘ একশো বছরের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন অবসান হয়।

ব্রিটিশ রাজের শাসন:

১৮৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসানের পর ভারতবর্ষের শাসনভার চলে যায় ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে। কোম্পানির শাসনের অবসান হলেও ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হতে পারেনি ভারতবর্ষ। কারন কোম্পানি শাসক ও ব্রিটিশ রাজশক্তি উভয়েই ছিল ইংরেজ জাতি। কোম্পানি শাসনের অবসানের পর শুধুমাত্র পরিবর্তন হয় শাসক শক্তি কিন্তু ইংরেজ শাসন বিদ্যমান থাকে। তাই প্রায় দুইশো বছর অর্থাৎ ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত কোম্পানি শাসন এবং ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজের শাসন সময়কালকে ইংরেজ শাসনামল বলে।

ব্রিটিশ রাজ শাসনের অবসান:

ইংরেজ শাসন চলাকালীন ভারতবর্ষের জনগণরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিবাদ করে। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন হয় যেটা “সিপাহি বিদ্রোহ” নামে পরিচিত। বিদ্রোহটি ইংরেজরা কঠোর হস্তে দমন করলেও এই ঘটনার মধ্যদিয়ে সূচনা হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ভারতবর্ষে অবসান ঘটে ইংরেজ কোম্পানির শাসন। কোম্পানি শাসন অবসানের পর ভারতবর্ষের ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজ রাজশক্তির হাতে। কিন্তু ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন ও সংগ্রাম চলমান থাকে। এভাবে চলমান আন্দোলনের মুখে এবং লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের কারনে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের বীজ নিহিত হয়। অবশেষে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষ থেকে পুরোপুরি ভাবে ইংরেজ শাসনের অবসান হয়।

বাংলার নবজাগরণ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব:

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন অবসানের মধ্য দিয়ে দ্বি-জাতি তত্ত্ব অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম এই দুই জাতির ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুইটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে ভারত এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান।ধর্মীয় ভাবে মুসলিম অধ্যুষিত হওয়ার কারনে বাংলাদেশকে করা হয় পাকিস্তানের অংশ। পাকিস্তানের দুইটি অংশ ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। আর এইভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। তবে পূর্ব বাংলার(বর্তমান বাংলাদেশ) স্বাধীনতা তখনো হয়নি। পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশ ভূখণ্ড পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ হওয়াতে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয় পরাধীনতা। বাংলাদেশের জনগণকে প্রকৃত স্বাধীনতার জন্য আবার নতুন করে আন্দোলন শুরু করতে হয়। শুরু হয় বাংলার নবজাগরণ।

লিখেছেন,
জাকির হোসেন,
মার্কেটিং বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party