অধ্যায়:৩,বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন।

JSC / বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অধ্যায়:৩,বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন।

আলোচ্য বিষয়সমূহ: সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন ধারণা এবং বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারন, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন, শিল্পকলা।

সংস্কৃতি:

সংস্কৃতি মানুষের সৃষ্টি। মানুষ তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং তার মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরনের লক্ষ্যে যা কিছু সৃষ্টি করে তাই হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

(১) বস্তুগত সংস্কৃতি,

(২) অবস্তুগত সংস্কৃতি।

বস্তুগত সংস্কৃতি : সংস্কৃতির যে সকল উপাদান দেখা বা ধরা যায় সে সব উপাদানগুলো হলো বস্তুগত সংস্কৃতি। যেমন পোশাক, তৈজসপত্র, ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র ইত্যাদি।

অবস্তুগত সংস্কৃতি : সংস্কৃতির যে সকল উপাদান দেখা বা ধরা যায় না সে সব উপাদানগুলো হলো অবস্তুগত সংস্কৃতি। যেমন জ্ঞান, চিন্তা-ভাবনা, আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস ইত্যাদি।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন ধারণা :

মানুষের সৃষ্টিশীল কাজই তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। সমাজ ও অঞ্চলভেদে সংস্কৃতির রূপ ভিন্ন হয়ে থাকে। আদিকাল থেকেই সমাজে বসাবাসকারী মানুষ সংস্কৃতিকে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনে উন্নীত করেছে। মানুষের ব্যবহার্য ও ভোগের সামগ্রী এবং চিন্তা চেতনার পরিবর্তনকে মানুষের সাংস্কৃতিক উন্নয়ন বলা হয়। অর্থাৎ সংস্কৃতির কাঙ্ক্ষিত বা ইতিবাচক পরিবর্তনই সাংস্কৃতিক উন্নয়ন। সংস্কৃতি এক প্রজন্ম হতে অন্য প্রজন্মের হস্তান্তরিত হয়। প্রজন্ম হতে প্রজন্ম হস্তান্তরিত হতে হতে সংস্কৃতির মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটে। আবার অন্য কোনো সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেও সংস্কৃতির রূপ বদল হয়। একেই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বলে।

সাধারণ ভাবে উন্নয়ন বলতে কোনো কিছু শুরু থেকে ক্রমশ পরিপূর্ণতা লাভ করাকেই বুঝায়। একসময় উন্নয়ন বলতে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বোঝানো হতো। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা উন্নয়ন বলতে “সামাজিক উন্নয়ন” কথাটিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। কোনো সমাজের উন্নয়নের কারণে যেমনি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয় তেমনি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলেও সমাজের উন্নয়ন ঘটে। যেমন- আগে বাংলাদেশে কৃষিকাজের জন্য লাঙ্গল ব্যবহার করা হতো। যেটা দিয়ে হালচাষ করা কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। বর্তমানে লাঙ্গলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রাক্টর। অর্থাৎ ব্যবহারের পরিবর্তন হয়েছে যেটা একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। ট্রাক্টর ব্যবহারের কারনে উৎপাদন বেড়েছে, এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে উন্নত হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। যেটা একটি সামাজিক পরিবর্তন। এইভাবে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সমন্বিতভাবে সমাজের উন্নয়ন ঘটায়।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের বৈশিষ্ট্য:

  • সাংস্কৃতিক পরিবর্তন উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত।
  • বস্তুগত সংস্কৃতি যত দ্রুত পরিবর্তন হয় অবস্তুগত সংস্কৃতি তত দ্রুত পরিবর্তন হয় না।
  • উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক চাহিদার পরিবর্তন হয়। যা সামাজিক পরিবর্তন হিসাবে গণ্য করা হয়। যা সংস্কৃতির ও পরিবর্তন।
  • সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইটি দিক থাকলে ও উন্নয়ন হলো সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন।
  • সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন দুটোই সময়ের মাত্রার মধ্যে সংগঠিত হয়।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারন:

সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। আদিকাল থেকেই সংস্কৃতির পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটে আসছে। সংস্কৃতির এই পরিবর্তনশীলতার কয়েকটি কারন রয়েছে। কারন গুলো হলো:

সাংস্কৃতিক ব্যপ্তি: এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে সংস্কৃতির প্রসার লাভ হলো সাংস্কৃতিক ব্যপ্তি। এক সমাজের সংস্কৃতি আরেক সমাজের সংস্পর্শে বা কাছে এসে একে অপরকে প্রভাবিত করে। এই ব্যপ্তির কারনে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়।

সাংস্কৃতায়ন: অন্য কোনো সাংস্কৃতিক উপাদানকে নিজ সংস্কৃতির সাথে আত্মস্থ করার প্রক্রিয়াকে সাংস্কৃতায়ন বলে। যেমন আমরা ইংরেজি চেয়ার, টেবিল, ফ্যান ইত্যাদি এইধরনের শব্দ বাংলা শব্দের মত ব্যবহার করছি। যা একটি সাংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া। এইভাবে সাংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়।

সাংস্কৃতিক আত্তীকরণ: মানুষ যখন নতুন কোনো সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসাবাস শুরু করে তখন তারা সেই সমাজের লোকদের আচার আচরন, চিন্তা চেতনা ও মূল্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ সংস্কৃতি আয়ত্ত করে। যেটি একটি আত্তীকরণ প্রক্রিয়া। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি চাকমা মেয়ে দীর্ঘদিন ঢাকায় বসাবাসের পর তাদের সাংস্কৃতিক পোশাক বাদ দিয়ে বাঙালি পোশাক সেলোয়ার-কামিজ, শাড়ি পরিধান শুরু করেছে।অর্থাৎ সে বাঙালি সংস্কৃতির আয়ত্ত শুরু করেছে।

সাংস্কৃতিক আদর্শ: প্রতিটি দেশ বা সমাজের রয়েছে নিজস্ব একটি সাংস্কৃতিক আদর্শ। কোনো দেশ বা সমাজের সাংস্কৃতিক আদর্শের মাঝে ঐ দেশ বা সমাজের মানুষের জীবনপ্রণালিও ফুটে ওঠে যেখানে সাংস্কৃতিক কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন : তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মুহূর্তেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্যের প্রান্তের খবর জানা যায়। প্রযুক্তির উন্নয়নে পুরো বিশ্ব এখন একটি বিশ্বগ্রামে পরিনত হয়েছে। যার কারনে খুব সহজেই এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন:

বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের জীবন আচরণ বা সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়৷ বাংলাদেশে বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি। পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, ফ্যাশন ইত্যাদিতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানের ইতিবাচক পরিবর্তন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, হোটেল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বহুজাতিক কোম্পানি, আধুনিক বিপণী বিতান ইত্যাদির সম্প্রসারণ হয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশের অনুকরণে প্রচলিত ধারার শিক্ষার সাথে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার চেষ্টা চলছে। এসব পরিবর্তন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে।

শিল্পকলা: সৃষ্টিশীল যেসব কাজে একটি জাতির চিন্তাশীল ও সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় সেটাই শিল্পকলা। শিল্পকলার মধ্যে তিনটি শাখা রয়েছে:

(১) দৃশ্যশিল্প (২) সাহিত্যশিল্প (৩) সঙ্গীতশিল্প।

দৃশ্যশিল্প: দৃশ্যশিল্প বেশিরভাগই বস্তুগত শিল্প। বাঙালির দৃশ্যশিল্পগুলো মধ্যে রয়েছে :

  • মাটি ও বাঁশের তৈরি ঘর: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ ঘর মাটি ও বাঁশের তৈরি।
  • টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্প: মাটির ফলক বা পাত তৈরি করে তাতে ছবি অঙ্কন করে পুড়িয়ে স্থায়ী রূপ দেওয়া।
  • তালপাতার পুঁথি: পালযুগে দেশীয় রঙ দিয়ে এসব পুঁথি আঁকা হয়েছে।
  • তাঁতশিল্প।
  • স্থাপত্যশিল্প : সুলতানি আমল থেকে এ শিল্পে ইরানি প্রভাব পড়তে শুরু করে। ছোট সোনা মসজিদ, নবাব কাটরা, ঢাকার লালবাগের কুঠি এ সময়ের স্থাপত্য নিদর্শন। নকশিকাঁথা কারুশিল্প শঙ্খের কাজ বাঁশ-বেত ও শোলার কাজ।

সাহিত্যশিল্প: বাঙালির সাহিত্য শিল্পের মধ্যে রয়েছে :

  • চর্যাপদ: বাঙালির প্রথম সাহিত্যকর্ম চর্যাপদ। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথম নেপালের রাজ দরবার থেকে চর্যাপদ আবিষ্কার করে। ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের কাল নির্ণয় করেন। চর্যাপদের অন্যতম রচয়িতা লুইপা ও কাহ্নপা।
  • বৈষ্ণব পদাবলী: শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার কাহিনি নিয়ে রচিত গান হলো বৈষ্ণব পদাবলী।
  • মঙ্গলকাব্য: দেশীয় দেবদেবীকে নিয়ে রচিত কাব্যকাহিনী হলো মঙ্গলকাব্য। চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও মনসামঙ্গল উল্লেখযোগ্য মঙ্গলকাব্য।
  • পুঁথিসাহিত্য: পারস্য থেকে পাওয়া কল্পকাহিনি ও রোমান্টিক আখ্যান নিয়ে পুঁথিসাহিত্য রচিত। ইউসুফ-জুলেখা, লায়লি-মজনু, সয়ফুল মুলক বদিজ্জামাল ও জঙ্গনামা উল্লেখযোগ্য পুঁথির নাম। মহাকবি আলাওল রচিত পদ্মাবতী পুঁথি ও বাংলা সাহিত্যে অন্যতম।
  • গদ্যসাহিত্য: ইংরেজ আমলে বাংলার গদ্যসাহিত্যের সূচনা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়েছেন।

সংগীত শিল্প : বাংলার সংগীত শিল্পের মধ্যে রয়েছে:

  • চর্যাপদ।
  • বৈষ্ণব পদাবলী।
  • বাউল ও ভাটিয়ালি : গ্রামের হিন্দু – মুসলমান সকলেই গেয়ে থাকে।
  • মুর্শিদি, পালাগান, বারমাস্যা, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা : এগুলো সব আঞ্চলিক গান।
  • পাঁচালি, খেউড়, খেমটা : এই গানগুলোর আসর বসত শহরাঞ্চলে।
  • বাংলার নাগরিক বা আধুনিক গান: নিধুবাবু, কালী মির্জা হয়ে আধুনিক গান উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে। বাংলা গানকে এর পর আরো অনেকেই সমৃদ্ধ করেছে। কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ছয় হাজারের মত গান লিখেছেন। আধুনিক বাংলা গানের সমৃদ্ধিতে অতুল প্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রজনীকান্ত সেনের অবদান ও ব্যাপক।
জাকির হোসেন, 
মার্কেটিং বিভাগ, 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party