অধ্যায়:২,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

JSC / বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অধ্যায়:২,বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

আলোচ্য বিষয়সমূহ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, ৭ই মার্চের ভাষণ, ২৫শে মার্চের গনহত্যা ,২৬শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা, মুজিবনগর সরকার, মুক্তিবাহিনী গঠন, মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী তৎপরতা এবং দেশী ও বিদেশীদের ভূমিকা, যৌথবাহিনীর যুদ্ধ, পাকিস্তানিদের গনহত্যা ও নির্যাতন এবং আত্মসমর্পণ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ:

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের (বর্তমান পাকিস্তান) বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) সশস্ত্র সংগ্রামই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মের পর বাংলাদেশ পাকিস্তানের অধীনে চলে যায়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতির উপর চাপিয়ে দেয় পরাধীনতা। তারা বাঙালি জাতির উপর শাসন, শোষণ ও নিপীড়ন চালাতে থাকে। এমনকি বাঙালি জাতির মুখের ভাষা বাংলাকে কেড়ে নিয়ে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এভাবে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি জাতি উপর শাসন, শোষণ, অত্যাচার, নিপীড়ন, বৈষম্য ও বাঙালির অধিকার হরন করতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির মনে জন্ম হয় ক্ষোভের। বাঙালি জাতি শুরু করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন ও সংগ্রাম। এই সংগ্রাম এক সময় সশস্ত্র সংগ্রামে পরিনত হয় এবং সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭০ এর নির্বাচন:

১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত নির্বাচনই হলো ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে(বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্য রা শপথ গ্রহন করেন।

নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি কে ক্ষমতা প্রদান করা হবে। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়া খানের সাথে সাথে ষড়যন্ত্র শুরু করে। ভুট্টোর ষড়যন্ত্র এবং পাকিস্তানের বহু রাজনীতিবিদদের সাথে আলোচনা করে ইয়াহিয়া খান একমত হন যে মুজিব কে ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। মুজিব কে ক্ষমতা প্রদান করা হলে দেশ ভাগ হয়ে যাবে। কারণ ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ “আগরতলা ষড়যন্ত্র” মামলায় ভারতের সহায়তায় পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে খন্ডিত বা আলদা করার জন্য বঙ্গবন্ধু কে ও অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি:

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রচিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করলেও ১ মার্চ ঘোষণা দেওয়া হয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বর্জনের। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়৷ শুরু হয় আওয়ামী লীগের সর্বাত্মক আন্দোলন যেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশ নেয়। এইভাবে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচিত হয়।

অসহযোগ আন্দোলন:

অসহযোগ আন্দোলন বলতে বোঝায় পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রশাসনিক কাজে পূর্ব পাকিস্তান অংশগ্রহণ করবে না। অর্থাৎ অফিস আদালত, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যাবে না। অফিস আদালত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ থাকবে।

১ মার্চ, ১৯৭১:

  • প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

২ মার্চ, ১৯৭১:

  • আওয়ামী লীগ ঢাকায় হরতালের ডাক দেয়।
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ ও ঢাকসু নেতৃবৃন্দ দেশের মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

৩ মার্চ, ১৯৭১:

  • আওয়ামী লীগ সারাদেশে হরতালের ডাক দেয়।
  • ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

৬ মার্চ, ১৯৭১:

  • ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষনে ২৫ শে মার্চ ঢাকায় পুনরায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করেন।

৭ মার্চ, ১৯৭১:

  • আওয়ামী লীগ এর উদ্যোগে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার আয়োজন।

২৫ মার্চ, ১৯৭১:

  • অসহযোগ আন্দোলন শেষ।
  • পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গনহত্যা শুরু করে।

২৬ মার্চ, ১৯৭১:

  • বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয় এবং শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
  • বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেফতার করে।

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ:

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আওয়ামী লীগ এর উদ্দেশ্যে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত ভাষন ৭ই মার্চের ভাষণ নামে পরিচিত। ৭ই মার্চের ভাষণের সময় রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন ১০ লক্ষ মানুষ।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ।পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে শুরু করে ষড়যন্ত্র ও টালবাহানা। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এসব ষড়যন্ত্র ও কর্মকাণ্ড দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলন এর কর্মসূচি ঘোষণা করেন৷ এই আন্দোলনের পটভূমিতে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে সমবেত উত্তাল জনসমুূদ্রে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষন দেন।

৭ই মার্চের ভাষণের ঘোষণা ও আহবান সমূহ:

  • আওয়ামী লীগের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশ পরিচালনা।
  • পাকিস্তান সরকারকে সর্বাত্মক অসহযোগিতা।
  • কোর্ট কাচারি, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ।
  • খাজনা – ট্যাক্স বন্ধ।
  • সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য জাতিকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান।
  • সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহবান।
  • বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নামকরণ চুড়ান্তকরন।
  • স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষণা।
  • ২৫ শে মার্চ অধিবেশনে যোগদান করার ব্যাপারে ৪টি পূর্বশর্ত বা দাবি ঘোষণা।
  • দাবি ৪টি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখা।

অধিবেশনে যোগদানের চারটি পূর্বশর্ত:

:ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর কর্মকাণ্ড দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন তারা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তাই নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ উন্মুক্ত করতে ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ঘোষিত ২৫ শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু চারটি পূর্বশর্ত ঘোষণা করেন। এই চারটি পূর্বশর্ত মেনে না নেওয়া পর্যন্ত অধিবেশনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বঙ্গবন্ধু এবং মেনে না নেওয়া পর্যন্ত বাঙালিকে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পূর্বশর্ত চারটি হলো:

১. সামরিক আইন প্রত্যাহার। ২. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। ৩. সেনাবাহিনীর গণহত্যার তদন্ত। ৪. সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া।

১৫ মার্চ, ১৯৭১:

  • ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং বঙ্গবন্ধুকে আলোচনার প্রস্তাব দেন।

১৬ মার্চ, ১৯৭১:

  • আলোচনা শুরু হয়।

২২মার্চ, ১৯৭১:

  • জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন এবং আলোচনায় অংশ নেন।

২৫ মার্চ ১৯৭১:

  • ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করে।
  • পাকিস্তানি সেনারা গনহত্যা শুরু করে, নির্বিচারে অসংখ্য বাঙালিকে হত্যা করে।

২৫ শে মার্চের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ:

অপারেশন সার্চলাইট:পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে ( বর্তমান বাংলাদেশ ) পরিকল্পিতভাবে যে গণহত্যা চালায় সেটাকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা নাম দিয়েছিল অপারেশন সার্চলাইট।

বাঙালি জাতিকে দমন করার জন্য মূলত এই অপারেশন চালানো হয়। এটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের আদেশে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। অপারেশন সার্চলাইটের জন্য মার্চের শুরু থেকে প্রস্তুতি নিয়েছিলো পাকিস্তানি বাহিনী। ৩রা মার্চ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এম. ভি. সোয়াত নামক একটা জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। যে জাহাজটি ছিল অস্ত্র ও রসদ বোঝাই। যে অস্ত্র রসদ গুলো মূলত অপারেশন সার্চলাইট নামক এই গণহত্যা অভিযান চালানোর জন্য আনা হয়েছিল। ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ থেকে ২৪ শে মার্চ আলোচনার ভান করে ঢাকায় এই গনহত্যার প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং অপারেশন সার্চলাইট চুড়ান্ত করেন। এই পরিকল্পনার সার্বিক তত্ত্বাবধান করেন জেনারেল টিক্কা খান। ঢাকা শহরে হত্যাকাণ্ডের মূল দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং ঢাকার বাইরে দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা।

ঢাকার পিলখানার ইপিআর হেডকোয়ার্টার্স ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন নিয়ন্ত্রণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও রেডিও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার, যাতায়াত ব্যবস্থাসহ ঢাকা শহর নিয়ন্ত্রণ ছিলই পাকিস্তানি বাহিনীদের মূল পরিকল্পনা। তাছাড়া রাজশাহী, যশোর, খুলনা, রংপুর, সৈয়দপুর, কুমিল্লায় বাঙালি সেনাবাহিনী, ইপিআর, আনসার ও পুলিশকে নিয়ন্ত্রণ এবং নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা ও ছিল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা গণহত্যা অভিযানও চালায়। গণহত্যার জন্য তারা প্রথম আক্রমণ চালায় ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় মিছিলরত মুক্তিকামী বাঙালির উপর। একই সাথে পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের অস্ত্রহীন বাঙালি সৈন্যদের উপর আক্রমণ চালায় এবং নির্মমভাবে হত্যা করে অনেককে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল( বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, ঢাকা হল (বর্তমান শহীদুল্লাহ হল), রোকেয়া হল সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় তারা আক্রমণ ও গণহত্যায় চালায়। যে গণহত্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষক, ৩০০ জন শিক্ষার্থী ও কর্মচারী নিহত হয়। তাছাড়া জহুরুল হক হল সংলগ্ন রেলওয়ে বস্তিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা আগুন দেয়।এভাবে ২৫ শে মার্চ রাতে গনহত্যা অভিযানে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় ৭০০০ থেকে ৮০০০ মানুষকে হত্যা করে।

ঢাকার বাইরেও সারাদেশে পাকিস্তানি সেনারা অসংখ্য বাঙালি সেনা ও নিরীহ লোককে হত্যা করে।এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২৫ শে মার্চ রাত দেড়টায় অর্থাৎ ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। তবে গ্রেফতারের আগেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান।

২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা :

পাকিস্তান বাহিনীদের হাতে গ্রেফতারের আগে ২৫ শে মার্চ রাতে অর্থাৎ ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের সকল স্থানে এ ঘোষণা ইপিআর এর ট্রান্সমিটার, টেলিগ্রাম ও টেলিপ্রিন্টারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে নাম দেওয়া হয় ” স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র “। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ শে মার্চ দুপুরে এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেন এবং ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

মুজিবনগর সরকার:

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য গঠিত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলা গ্রামে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। শপথ বাক্য পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বৈদ্যনাথতলা গ্রামের নামকরণ হয় মুজিবনগর। মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অন্যান্য কাজের জন্য গঠন করা হয়েছিল তাই মুজিবনগর সরকারকে অস্থায়ী সরকার ও বলা হয়। মুজিবনগর সরকারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম : মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে গ্রেফতার থাকার কারনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কর্তব্য পালনের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন তিনি।

তাজউদ্দীন আহমদ : মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।

এম. মনসুর আলী : মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম. মনসুর আলী।

এ এইচ এম কামারুজ্জামান : মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, ত্রান ও পুনর্বাসন মন্ত্রী ছিলেন ও এইচ এম কামারুজ্জামান।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ : মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী ছিলেন খন্দকার মোশতাক।

মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম:

মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রমকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা হয়েছিলো।

(১) বেসামরিক কার্যক্রম (২) সামরিক কার্যক্রম

প্রত্যেক সরকারের মত মুজিবনগর সরকারেরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর ছিল। মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশকে ১১ টি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত করে। আওয়ামী লীগ নেতা সহ মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মণি সিংহ, ন্যাপ এর সভাপতি মোজাফফর আহমদ ও মনোরঞ্জন ধরকে নিয়ে ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীকে নিয়ে মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশন গঠন করেন।

মুক্তিবাহিনী গঠন ও কার্যক্রম:

সুষ্ঠু ও পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য মুজিবনগর সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা ও মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল এম. এ. জি ওসমানী। চিফ অব স্টাফ ছিলেন কর্নেল (অব.) আবদুর রব। ডেপুটি চিফ স্টাফ ছিলেন এ. কে. খন্দকার। যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং ১১ টি সেক্টরে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। প্রতিটি সেক্টর বেশ কয়েকটি সাব সেক্টরে বিভক্ত ছিল। এছাড়া ও তিনটি বিগ্রেড ফোর্স গঠন করা হয়। ফোর্সের নামকরণ করা হয় অধিনায়কদের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে। ফোর্স তিনটি হলো :

১. জেড ফোর্স – জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।

২. এস ফোর্স – এস ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন কে. এম. শফিউল্লাহ।

৩. কে ফোর্স – কে ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ।

মুক্তিবাহিনী সরকারি পর্যায়ে দুইটি শাখায় বিভক্ত ছিল। (১) নিয়মিত বাহিনী (২) অনিয়মিত বাহিনী।

নিয়মিত বাহিনী : ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইউনিটগুলোর বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে নিয়মিত বাহিনী গঠিত হয়। সরকারিভাবে নিয়মিত বাহিনীর নামকরণ করা হয় এম. এফ (মুক্তিফৌজ)। মুজিবনগর সরকার নিয়মিত বাহিনী হিসাবে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী গড়ে তোলে।

অনিয়মিত বাহিনী : ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষক ও সকল পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে অনিয়মিত বাহিনী গঠিত হয়। সরকারিভাবে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয় গণবাহিনী বা এফ. এফ. ( ফ্রিডম ফাইটার বা মুক্তিযোদ্ধা)। এই বাহিনীকে নিজ নিজ এলাকায় গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার জন্য প্রেরণ করা হতো।

আঞ্চলিক বাহিনী : সেক্টর এলাকার বাইরে আঞ্চলিক পর্যায়ে বেশ কিছু বাহিনী গড়ে উঠে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য :

  • কাদেরিয়া বাহিনী – টাঙ্গাইল
  • আফসার ব্যাটালিয়ন – ভালুকা, ময়মনসিংহ
  • বাতেন বাহিনী – মাগুরা
  • লতিফ মীর্জা বাহিনী – সিরাজগঞ্জ,
  • পাবনা জিয়া বাহিনী – সুন্দরবন
  • ক্র‍্যাক প্লাটুন – ঢাকা

মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী শক্তির তৎপরতা ও ভূমিকা:

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি লোক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। তারা চেয়েছিলো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করুক এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের একটি ক্ষুদ্রাংশ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ছিল। তারা চাননি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। তাই তারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা ও ধর্মের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে মিলে হত্যা, লুট, অগ্নিকাণ্ড, নারী নির্যাতনসহ সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিকামী বাঙালিদের খুঁজে বের করে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে দিতো।

বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে :

  • শান্তি কমিটি
  • রাজাকার
  • আলবদর
  • আলশামস
  • ডা. মালিক মন্ত্রিসভা

মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালি ও দেশিয়দের ভূমিকা:

প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাঙালিরা গণহত্যারর প্রতিবাদে ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে একত্রিত হতে থাকে। যুক্তরাজ্যকে কেন্দ্র করে সমগ্র ইউরোপে প্রবাসী বাঙালিদের আন্দোলন চলে। বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা সভা-সমাবেশ করে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং যুদ্ধে ব্যয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে।

বাঙালি কেউ কেউ ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়। বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের বাঙালি কর্মকর্তারা পদত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বহির্বিশ্বের সমর্থন আদায় ও জনমত গঠনের জন্য মুজিবনগর সরকার বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় জাতিসংঘে ৪৭ টি দেশের প্রতিনিধি বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে এবং এতে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়।

মুজিবনগর সরকার দিল্লি, কলকাতা, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করে। এসব মিশন বাংলাদেশের পক্ষে মিছিল, সমাবেশ, সমর্থন আদায় এবং জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে বহির্বিশ্বের ভূমিকা:

বাঙালি ছাড়া বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখে। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে।

ভারতের ভূমিকা : ভারত সরকার ২৫ শে মার্চ থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর গনহত্যার নিন্দা করে এবং গনহত্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য সীমানা পেরিয়ে ভারতে চলে যাওয়া প্রায় এক কোটি বাঙালি শরনার্থীকে আশ্রয় দেয় ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়৷ ভারতেই বাঙালিরদের সশস্ত্র ট্রেনিং চলে। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ বিভিন্ন মন্ত্রী নেতা ও কর্মকর্তারা বিদেশ সফর করে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন করে। ভারতের সেনাবাহিনীও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠিত হয়। ভারতের জনগণও মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও সব ধরনের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসে। ভারত সরকার বাঙালি শরনার্থীদের ব্যয় নির্বাহের জন্য ভারতে ‘শরনার্থী কর’ নামে নতুন একটি করও চালু করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় চার হাজার অফিসার ও জোয়ান প্রাণ দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা: সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ভূমিকা রেখেছিল। সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নি বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য ইয়াহিয়া খানকে চিঠি দেন। যৌথবাহিনীর ঢাকা দখল করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি ঠেকিয়ে রাখার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের কুটনৈতিক প্রচেষ্টায় জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রদান করে।

অন্যান্য দেশ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা : যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিরোধী দলের চাপে ভারতে অবস্থানরত বাঙালি শরনার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস পার্টির অনেক সদস্য, বিভিন্ন সংবাদপত্র, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদসহ যুক্তরাষ্ট্রের সর্বস্তরের জনগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ কনসার্ট’ আয়োজন করে এবং সেই কনসার্ট থেকে প্রাপ্ত অর্থ তিনি বাংলাদেশের মুজিবনগর সরকারকে দেয়। ভারতের খ্যাতিমান শিল্পী রবি শঙ্কর বাংলাদেশ কনসার্ট আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম।

তাছাড়া বিদেশি সাংবাদিকরা ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার সময় থেকে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। বিদেশি সাংবাদিকরাই প্রথম বহির্বিশ্বে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গনহত্যা ও বর্বরতার খবর ছড়িয়ে দেয়। সাইমন ড্রিং এইরকমই একজন সাংবাদিক ছিলেন। এন্থনি ম্যাসকারেনহাস ও পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য সারা বিশ্বে প্রকাশ করেন। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি পুরোটা সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে খবর প্রচার করেছেন। অবরুদ্ধ থেকেও অনেক বাঙালি সাংবাদিক ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বে খবর পাঠিয়েছে। একাত্তরের শহিদ নিজামউদ্দিন ও নাজমুল হক এইরকমই দুজন সাংবাদিক। আকাশবাণী, বিবিসি, ভোয়া প্রভৃতি বেতারকেন্দ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিল।

যৌথবাহিনীর নেতৃত্বে চুড়ান্ত যুদ্ধ:

মুজিবনগর সরকারের সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ পরিকল্পনার ফলে একাত্তরের মে মাস থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী মোকাবিলা শুরু করে। জুন মাস থেকে ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাঙালি গেরিলা যোদ্ধারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকিস্তানি বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাতে শুরু করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীকে কার্যকর সহায়তা দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী মিলে গঠিত হয় যৌথবাহিনী। যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনীর সহায়তাকারী ভারতীয় বাহিনীকে মিত্রবাহিনী বলা হতো। যৌথবাহিনী গঠনের ফলে যুদ্ধ দারুণ গতি লাভ করে।

১৩ নভেম্বর, ১৯৭১:

  • ট্যাংকসহ দুই ব্যাটালিয়ন ভারতীয় সৈন্য যশোরে ঘাঁটি স্থাপন করে।

২১ নভেম্বর, ১৯৭১:

  • যৌথবাহিনী গঠন করা হয়।

৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

  • পাকিস্তানি বিমানবাহিনী ভারতের বিমান ঘাঁটিতে হামলা করে এবং পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়।

৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

  • ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

  • যৌথবাহিনী যশোর শহরে প্রবেশ করে।

৮ ও ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১:

  • কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নোয়াখালী শহর যৌথবাহিনীর দখলে আসে।

১০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ :

  • হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল নিরপেক্ষ ঘোষিত হয় এবং ঢাকায় অবস্থানকারী কূটনৈতিকবৃন্দ ও বিদেশি নাগরিকদের সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়।

১১ ও ১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১ :

  • ময়মনসিংহ, হিলি, কুষ্টিয়া, খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয়।

১৪ ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ :

  • ঢাকা ছাড়া দেশের অন্যত্র অনেক বড় শহর ও সেনানিবাসে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
  • পাকিস্তানির বাহিনীর যুদ্ধের সমাপ্তি হয়।
  • যৌথবাহিনী ঢাকা শহরের চারদিক ঘেরাও করে রাখে। যে কোনো সময় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে পারে অবস্থা সে পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আত্মসমর্পণের সুবিধার্থে যৌথবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল স্যাম মানেকশ এর আহ্বানে উভয় পক্ষ ১৬ ই ডিসেম্বর বিকেল তিনটা পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ : পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

গনহত্যা ও নির্যাতন :

পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ শে মার্চ থেকে বাঙালির উপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী দেখা মাত্রা তারা হত্যা করে। হিন্দু সম্প্রদায়কে হত্যা করে এবং তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও পাড়া গ্রাম লুট করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার আলবদরদের ভয়ে দেশের মানুষ আত্মগোপন করে জীবন কাটিয়েছে। প্রায় এক কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে৷ দেশের অবরুদ্ধ মানুষ ও পাকিস্তানি বাহিনীর গনহত্যার শিকার হয়। গনহত্যা চালাতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বাংলাদেশে অনেক বধ্যভূমি তৈরি করে যেখানে তারা বাঙালিদের হত্যা করত। পুরো নয় মাস জুড়ে বাংলাদেশে চলে গণহত্যা ও নির্যাতন। হাত পা বেঁধে গুলি করে হত্যা, একটি একটি করে অঙ্গচ্ছেদ করে গুলি করে হত্যা, চোখ উপড়ে ফেলা, মাথায় আঘাত করে চূর্ণ বিচূর্ণ করা, মুখ থেঁতলে দেওয়া, বেয়নেট ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলা, আঙুলে সূঁচ ফুটানো, শরীরের চামড়া কেটে লবণ ও মরিচ দেওয়া ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতনের ধরন। যৌথবাহিনী আক্রমণের ফলে যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হয় তখন তারা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার নীল নকশা তৈরি করে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিল্পী সাহিত্যিককে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ :

১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনী কাছে আত্মসমর্পণ করে। অর্জিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়। বিজয় লাভ করে বাঙালি জাতি। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্থান পায় বাংলাদেশ।

রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন যৌথবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। খোলা আকাশের নিচে একটি টেবিলে বসে যৌথবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল এ. এ. কে নিয়াজি আত্মসমর্পণ দলিলে সাক্ষর করেন। বন্দী করা হয় পাকিস্তানি বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্যকে ।

জাকির হোসেন,
মার্কেটিং বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party