অধ্যায়:৫,সামাজিকীকরণ ও উন্নয়ন।

JSC / বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অধ্যায়:৫,সামাজিকীকরণ ও উন্নয়ন।

আলোচ্য বিষয়সমূহ: সামাজিকীকরণ, সামাজিকীকরণের মাধ্যম, বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, সামাজিকীকরণে তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা।

সামাজিকীকরণ:

প্রত্যেক সমাজের কিছু প্রথা, নিয়ম-রীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আদর্শ রয়েছে। মানুষকে এগুলো আয়ত্ত করতে হয়। সমাজের এ নিয়ম-রীতি আয়ত্ত করার প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলে। সামাজিকীকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। শৈশব থেকে বৃদ্ধকাল পর্যন্ত সামাজিকীকরণ চলতে থাকে।

সামাজিকীকরণের বিভিন্ন মাধ্যম:

শিশুর সামাজিকীকরণের বিভিন্ন মাধ্যম বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব রয়েছে। যথা-

পরিবার : সামাজিকীকরণ এর কতগুলো মাধ্যম রয়েছে তার মধ্যে পরিবার অন্যতম। পরিবার হলো সামাজিকীকরণের প্রাথমিক ক্ষেত্র এবং প্রথম ও প্রধান বাহন। একটি শিশু জন্মের পর থেকেই পরিবারের সাথেই থাকে। চলাফেরা, কথাবার্তা, নিয়ম-রীতি, আচার -আচরন,ধর্মচর্চা, শিক্ষা গ্রহন, নৈতিকতা সম্পর্কে একটি শিশু পরিবার থেকেই প্রাথমিক শিক্ষালাভ করে। পরিবারেই শিশু তার চিন্তা, আবেগ ও কর্মের অভ্যাস গঠন করে। পরিবারের সদস্যদের আচার-আচরণ, চাল-চলন, রীতি-নীতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক – পরিচ্ছদ, ধর্মচর্চা, শিক্ষা গ্রহন সবকিছুই একটি শিশুর আচরণের উপর প্রভাব ফেলে। তাই বলা যায় শিশুর সামাজিকীকরণের পরিবারের অবদান সবচেয়ে বেশি।

স্থানীয় সমাজ:মা-বাবা বা পরিবারেরর পর শিশুর সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্থানীয় সমাজ। কারন পরিবারের পরই সমাজের রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধ একটি শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলে। পরিবারেরই সদস্যদের পর একটি শিশু সমাজের মানুষের সাথেই মিশে। চারপাশের মানুষের আচার-আচরন ও রীতিনীতি দেখতে দেখতে শিশু বেড়ে উঠে। এভাবেই সে সমাজের রীতিনীতি সহজে শিখে যায়।

স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন উপাদান : স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা সাহিত্য, সমিতি, সাংস্কৃতিক সংঘ, খেলাধুলার ক্লাব, সংগীত শিক্ষা কেন্দ্র, বিজ্ঞান ক্লাব প্রভৃতি সংগঠনের সঙ্গে ব্যক্তি নিজেকে জড়ায়। এসব সংগঠন ব্যক্তির চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব ফেলে। এসব সংগঠনের মাধ্যমে নতুন নতুন অনেক শেখা হয়। যা ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করে।

সমবয়সী সঙ্গী বা খেলার সাথি: শিশুর সামাজিকীকরণ এ তার সমবয়সী সঙ্গী বা খেলার সাথিরা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চালচলনের ক্ষেত্রে একে অন্যকে প্রভাবিত করে। সমবয়সী সঙ্গীদের সাথে মেশার আকর্ষণ বা প্রবনতা বেশি থাকার কারনে একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : সামাজিকীকরনের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুরা শুধু জ্ঞান লাভ নয় তারা সামাজিক মূল্যবোধ, আচার আচরণ ও শিখে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশুরা সমবয়সী সঙ্গী ও পায় যার মাধ্যমে তারা অনেক কিছু শেখে, তাছাড়া শিক্ষকদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখে। পাঠ্যপুস্তক থেকে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নৈতিকতা সহ বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান লাভ করে যা শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও আচরণে প্রভাব ফেলে।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান : রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানও ব্যক্তির সামাজিকীকরণ এ প্রভাব ফেলে। রাজনৈতিক দলের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে ব্যক্তি অনেক কিছু শেখে। নেতৃত্ব দেওয়া, একটি দল গঠন, দল পরিচালনা করা, অন্যায় কাজের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম ইত্যাদি অনেক কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শিখতে পারে।

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া:

গ্রাম ও শহর সমাজ মিলেই বাংলাদেশের বৃহত্তর সমাজ কাঠামো গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% লোক গ্রামে বাস করে। এদেশের অধিকাংশ মানুষের সামাজিকীকরণ ঘটে গ্রামীণ পরিবেশে। গ্রামীণ পরিবেশে শিশুর সামাজিকীকরণ ও শহরের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর সামাজিকীকরণে পার্থক্য রয়েছে।

গ্রামের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া : বাংলাদেশের গ্রাম সমাজ কাঠামোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো – একক ও যৌথ পরিবার কাঠামো, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা, সহজ-সরল জীবন যাপন, জীবনযাত্রায় সামাজিক প্রথা ও লোকচারের প্রভাব প্রভৃতি। তাছাড়া এ সমাজ কাঠামোতে দেখা যায় প্রতিবেশীসুলভ আচরণ, ধর্মীয় আচার আচরণের প্রতি গভীর মনোযোগ। গ্রামের শিশু কিশোরেরা এ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পরিবেশেই বড় হতে থাকে। ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া করে এ সমাজের বিভিন্ন উপাদানের সাথে। এসব ব্যক্তির সামাজিকীকরণকে প্রভাবিত করে।

শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া : বাংলাদেশের শহর সমাজ কাঠামোর বৈশিষ্ট্য হলো একক পরিবার কাঠামো, শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি, জটিল সমাজ জীবন, শহরের সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের দুরত্ব প্রভৃতি। পরিবেশের এরূপ বিভিন্ন উপাদানের সাথে ব্যক্তির আচরণিক ক্রিয়া- প্রতিক্রিয়া ঘটে। এসব কিছু ব্যক্তির সামাজিকীকরণকে প্রভাবিত করে। গ্রামীণ সমাজ ও শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও দুই সমাজের মধ্যে কিছু সাদৃশ্যপূর্ণ উপাদান প্রভাব বিস্তার করে। যেমন: বন্ধু বা খেলার সাথি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রভৃতি। গ্রামের শিশুদের যেমন বন্ধু বা খেলার সাথি থাকে শহরের শিশুদের ও থাকে। গ্রাম শহর উভয় সমাজে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আছে।

সামাজিকীকরণে তথ্য প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের ভূমিকা:

গণমাধ্যম সমূহ যেমন- সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ব্যক্তির সামাজিকীকরণে ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া ইন্টারনেট প্রযুক্তি বর্তমানে যোগাযোগকে খুবই সহজ করে দিয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিমুহূর্তে আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের সাথে ভাব বিনিময়, তথ্য আদান প্রদান করা যায় যা ব্যক্তির সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন : সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন গণমাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বের রীতি নীতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে তথ্য পরিবেশিত ও আলোচিত হয়। এছাড়া সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে বিভিন্ন শিক্ষামূলক তথ্য প্রচার করা হয় যা ব্যক্তির সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে।

বেতার বা রেডিও : বেতারে সংবাদের পাশাপাশি, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। যার মাধ্যমেও বক্তি অনেক কিছু শেখে এবং তা সামাজিকীকরণে ভূমিকা পালন করে।

টেলিভিশন : বর্তমানে অন্যান্য গণমাধ্যমের মধ্যে জনপ্রিয় হলো টেলিভিশন। বেতারের মাধ্যমে শোনা যায়। কিন্তু টেলিভিশন এর মাধ্যমে দেখা শোনা উভয় করা যায়। টেলিভিশন এর মাধ্যমে দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন খবরাখবর জানা যায়। ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রচারের কারনে দেশ ও বিশ্বের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়, বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনেক কিছু শেখা যায় যা ব্যক্তির সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লচ্চিত্র : চলচ্চিত্র সামাজিকীকরণের বাহন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে যদি তা শুধু বিনোদনধর্মী না হয়ে আদর্শ ও বাস্তবধর্মী শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র হয়। সুস্থ, রুচিশীল ও শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র মানুষকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সহমর্মিতা বোধ জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইলেক্ট্রনিক মেইল : ই-মেইল হচ্ছে ইলেকট্রনিক মেইল কথাটির সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে ও কম খরচে দেশ-বিদেশে চিঠি ও তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। ই- মেইল বিশ্বব্যাপী এনেছে যোগাযোগের যুগান্তকারী পরিবর্তন। যেটি ব্যক্তির সাথে বিশ্বের একটি সংযোগ স্থাপনকারী হিসেবে কাজ করে। যা ব্যক্তির সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে।

ইলেক্ট্রনিক কমার্স : ই-কমার্স হলো ইলেকট্রনিক কমার্স এর সংক্ষিপ্ত রূপ। এ পদ্ধতিতে অনলাইনে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে পণ্য ক্রয় বিক্রয় করা যায়। যেটার পরিধি শুধু দেশেই নয় বরং পুরো বিশ্বব্যাপী। বিশ্বব্যাপী সকল ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে ই-কমার্স। এই সংযোগ ব্যক্তির সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে।

ফেসবুক ও টুইটার : ফেসবুক ও টুইটারের মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোর মাধ্যমে দেশ বিদেশের যেকোনো মানুষের সাথে খুব সহজেই যোগাযোগ, ভাব বিনিময়, তথ্য আদান প্রদান, ছবি আদান প্রদান, বন্ধুত্ব করা যায়। যা ব্যক্তির সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জাকির হোসেন,
মার্কেটিং বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party