অধ্যায়:৪,ঔপনিবেশিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য।

JSC / বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অধ্যায়:৪,ঔপনিবেশিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য।

আলোচ্য বিষয়সমূহ: ঔপনিবেশিক যুগ, প্রত্নসম্পদ, ঢাকা শহরের প্রত্ননির্দশন, ঢাকার বাইরের প্রত্ননির্দশন, জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ।

ঔপনিবেশিক যুগ:

যে যুগে একটি দেশ অন্য একটি দেশের শাসনাধীনে থাকে সে যুগকে ঔপনিবেশিক যুগ বলে।

১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার শাসনভার ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ইংরেজ শাসনামল চলে ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশে ইংরেজ শাসনামলের এই প্রায় দুইশত বছরকে ঔপনিবেশিক যুগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও এরপরে বাংলাদেশকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে কাটাতে হয়েছে।

প্রত্নসম্পদ বা প্রত্ননির্দশন:

প্রত্ন শব্দের অর্থ হলো পুরোনো বা প্রাচীন। আর সম্পদ শব্দের অর্থ প্রতিপত্তি বা ঐশ্বর্য। প্রত্নসম্পদ বলতে পুরোনো স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম, মূর্তি বা ভাস্কর্য, অলংকার, প্রাচীন আমলের মুদ্রা, পুরোনো মূল্যবান আসবাবপত্র ইত্যাদিকে বোঝায়।

ঢাকা শহরের প্রত্ননির্দশন :

ঔপনিবেশিক যুগে ঢাকায় বেশ কিছু স্থাপত্যকর্ম গড়ে উঠেছিল। ঢাকার স্থাপত্যকর্ম বা প্রত্ননির্দশন গুলো হলো:

  • মসজিদ
  • মন্দির
  • গির্জা
  • বাহাদুর শাহ পার্ক
  • আহসান মঞ্জিল
  • রূপলাল হাউস
  • রোজ গার্ডেন
  • কার্জন হল
  • হাইকোর্ট ভবন
  • গ্রিক সমাধিসৌধ

মসজিদ : ঢাকার মসজিদ গুলো মোগল ও কিছুটা ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। উনিশ শতকে তৈরি ঢাকার উল্লেখযোগ্য মসজিদ গুলো হলো: লালবাগ মসজিদ

  • লক্ষ্মীবাজার মসজিদ
  • কলুটোলা জামে মসজিদ
  • বেচারাম দেউড়ি মসজিদ
  • কায়েতটুলি মসজিদ
  • সিতারা বেগম মসজিদ

মন্দির:ঢাকা শহরেরঔপনিবেশিক যুগের আগে উল্লেখযোগ্য মন্দির হলো-

  • ঢাকেশ্বরী মন্দির
  • রমনা কালীমন্দির( ঔপনিবেশিক যুগের আগে তৈরি হলেও ঔপনিবেশিক যুগে আবার নতুন করে নির্মান করা হয়)

গির্জা: আঠারো-উনিশ শতকে ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি গীর্জা ও তৈরি করা হয়। গির্জা গুলো হলো-

  • আর্মেনিয়ান গির্জা
  • সেন্ট টমাস এ্যাংলিকান গির্জা
  • হলিক্রস গির্জা

বাহাদুর শাহ পার্ক : বাহাদুর শাহ পার্ক ঢাকায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান। ১৯৫৭ সালের আগ পর্যন্ত পার্কটি ভিক্টোরিয়া পার্ক নামে পরিচিত ছিল।

উনিশ শতকে সদরঘাট এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ঢাকার নওয়াব আবদুল গণি এই পার্ক তৈরি করে তৎকালীন ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়ার নামে এই পার্কের নাম দেন ভিক্টোরিয়া পার্ক। ভিক্টোরিয়া পার্ক তৈরির আগে জায়গাটির নাম ছিল আন্টাঘর ময়দান। ১৮৫৭ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে এদেশীয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সৈন্যরা বিদ্রোহ শুরু করেন। যেটা সিপাহী বিদ্রোহ নামে পরিচিত। বিদ্রোহটি ইংরেজরা কঠোর হস্তে দমন করেন এবং বিদ্রোহী সৈন্যদের মধ্যে যারা ঢাকায় ইংরেজদের হাতে বন্দী হন তাদের ইংরেজরা এই আন্টাঘর ময়দানে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে ফাসি দেয়। এই ঘটনার ঠিক একশো বছর পর ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতার জন্য প্রাণদানকারী সৈনিকদের স্মৃতিতে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয় এবং ভিক্টোরিয়া নাম পরিবর্তন করে ভারতবর্ষের শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নামে পার্কটির নাম হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

কার্জন হল : অফিস বাড়ি হিসেবে ঢাকায় যেসব ভবন তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে কার্জন হল। ইংরেজ আমলে এ ভবনটি তৈরি হয়। বহুকাল ধরেই এ ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের অংশ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

গ্রিক সমাধিসৌধ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের চত্বরে অবস্থিত গ্রিক সমাধিসৌধটি ১৯১৫ সালে নির্মিত। ইংরেজ আমলে নির্মিত হলেও বর্গাকার ও সমতল ছাদযুক্ত এ স্থাপত্যে প্রাচীন গ্রিসের ‘ডরিক রীতি’ অনুসৃত হয়েছে।

ঢাকার বাইরের প্রত্ননির্দশন:

ঢাকার বাইরে ও অনেক প্রত্ননির্দশন রয়েছে। ঢাকার বাইরের প্রত্ননির্দশন গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • পানাম নগরে সড়কের দুইপাশের ইমারত বা ঘরবাড়ি
  • সরদারবাড়ি
  • আনন্দমোহন পোদ্দারের বাড়ি
  • হাসিময় সেনের বাড়ি
  • শশীলজ
  • বালিয়াটির জমিদার বাড়ি
  • তাজহাট জমিদার বাড়ি
  • দিঘাপতিয়ার জমিদার প্রাসাদ

পানাম নগর, সোনারগাঁও : সুলতানি আমলে বাংলার রাজধানী ছিল সোনারগাঁও। মোগল যুগে এর গুরুত্ব কমে গেলেও মসলিন শাড়ির উৎপাদন ও ব্যবসাকেন্দ্র হিসাবে সোনারগাঁওয়ের খ্যাতি ছিল। উনিশ শতকে অনেক ধনী ব্যবসায়ী বসাবাসের জন্য সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর বেছে নেন এবং পানামের মূল সড়কের দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে অনেক ঘরবাড়ি বা ইমারত নির্মাণ করেন। পানামনগরে এখনো ৫২ টি ইমারত টিকে আছে। ব্রিটিশ বা ইংরেজ আমলে নির্মিত এসব ইমারত বা ভবন গুলোতে ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। তবে এসব ভবন নির্মাণকলায় মোগল স্থাপত্যের ও প্রভাব রয়েছে।

সরদারবাড়ি : পানামের আশেপাশের একটি চমৎকার ইমারত। এ বাড়ি ১৯০১ সালে বড় দুইটি প্রাসাদকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে। প্রাসাদ দুইটিকে একটি করিডোর বা লম্বা বারান্দা দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি দোতলা ভবন যেখানে রয়েছে ৭০ টি কক্ষ বা রুম। রঙিন মোজাইকের নানা কারুকার্যে শোভিত এ বাড়িটি। এই সরদারবাড়িতে স্থাপিত হয়েছে লোকশিল্প জাদুঘর।

শশীলজ : ময়মনসিংহের শশীলজ একটি অনুপম সুন্দর প্রাসাদ ও স্থাপত্য নিদর্শন। মুক্তাগাছার জমিদাররা এটি তৈরি করেছিলেন।

দিঘাপতিয়ার জমিদার প্রাসাদ: নাটোরের দিঘাপতিয়ার জমিদার প্রাসাদ একটি চমৎকার স্থাপত্যকর্ম। এই প্রাসাদ বা বাড়ি এখন উত্তরা গণভবন নামে পরিচিত।

জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ:

বাংলাদেশে পাওয়া প্রত্ননির্দশন গুলো জাদুঘরে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়। দেশের পুরানো ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্ম কে ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্য প্রত্ননির্দশন গুলো জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়। জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ গুলো-

জাতীয় জাদুঘর : ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। এই জাদুঘরে বিভিন্ন প্রত্ননির্দশনের সঙ্গে বাংলার জমিদার, মহারাজা, নবাব ও ইংরেজ আমলের বেশ কিছু প্রত্নসম্পদ সংরক্ষিত আছে। যেমন:

  • দিনাজপুরের মহারাজার ব্যবহার করা দ্রব্য ও হাতির দাঁতের কারুকাজ করা শিল্পদ্রব্য।
  • বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর পোশাক, হাতির দাঁতের নানা কারুকাজ করা দ্রব্য ও ঢাল-তলোয়ার।
  • নাটোরের দিঘাপতিয়ার জমিদারের ব্যবহার করা দ্রব্য, পোশাক, ঢাল-তলোয়ার ও সিংহাসন।
  • ঢাকার নওয়াবদের ব্যবহার করা পোশাক ও জিনিসপত্র।

এছাড়া অধিকাংশ আঞ্চলিক জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় নানা প্রত্ননির্দশন সংরক্ষিত আছে। অধিকাংশ আঞ্চলিক সংগ্রহশালা জমিদারদের পুরোনো প্রাসাদে অবস্থিত। আঞ্চলিক সংগ্রহশালাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • আহসান মঞ্জিল
  • ময়মনসিংহ জাদুঘর
  • তাজহাট জমিদার প্রাসাদ
  • রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি।

আহসান মঞ্জিল : ঢাকার আহসান মঞ্জিল একটি জাদুঘর। ঢাকার নওয়াবদের ব্যবহার করা পোশাক, খাট- পালঙ্ক, চেয়ার, সোফা, অলঙ্কার ও আলোকচিত্র এখানে সংরক্ষিত আছে।

ময়মনসিংহ জাদুঘর: ময়মনসিংহ শহরে ১৯৬৯ সালে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ময়মনসিংহের জমিদারদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র এখানে সংরক্ষিত আছে।মুক্তাগাছার জমিদারদের প্রত্নসম্পদ এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে।

তাজহাট জমিদার প্রাসাদ: রংপুরের তাজহাট জমিদার প্রাসাদ ও একটি জাদুঘর। উত্তরবঙ্গের প্রত্ননির্দশন, তাজহাট জমিদারদের ব্যবহার করা দ্রব্যসামগ্রী, সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা পান্ডুলিপি এই প্রাসাদে সংরক্ষণ করা আছে।

রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অবস্থিত। এই কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথের নানা নির্দশন ও আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা আছে।

জাকির হোসেন,
মার্কেটিং বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave your thought here

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Free 10 Days

Master Course Invest On Self Now

Subscribe & Get Your Bonus!
Your infomation will never be shared with any third party